করোনা প্রভাবে লাগাতার লকডাউনে মূলধন সংকটে পড়েছেন নারী উদ্যোক্তারা। এ অবস্থায় অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি নারী উদ্যোক্তার হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা সরকারের কাছে পৃথক প্রণোদনা ও সহযোগিতার দাবি জানিয়েছেন। এ খাতের নেতৃবৃন্দ বলেছেন, অন্তত ছয় মাসের জন্য ভ্যাট-ট্যাক্স মওকুফ, সুদবিহীন ঋণ এবং ছয় মাস বাড়ি ভাড়া না নেওয়ার ব্যবস্থা করলেই নারী উদ্যোক্তারা ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন।
জানুয়ারি থেকে বৈশাখের পুরো প্রস্তুতি নিয়ে নারী দিবসের একটা মেলা করেন সিন্ধা দত্ত। সেখানে তার ভালোই লাভ হয়। কিন্তু এবার মেলা করতে না পারায় বড়ো ধরনের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে তার।
বিবিআনার লিপি খন্দকার বলেন, রোজার ঈদ আর বৈশাখে আমাদের বড়ো ক্রেতা থাকে। এবার তা তো পেলামই না। বসে বসে বেতন-ভাড়া দিতে হচ্ছে। আবার আমাদের সঙ্গে যেসব ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা জড়িত আছেন তারাও মহাবিপাকে। কয়েক বছর আগে রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য অনেক তাঁতি আর কুটিরশিল্প উদ্যোক্তাকে আমরা হারিয়েছি। এবারের অবস্থা আরো ভয়াবহ। দু’তিন মাস এভাবে চললে আমাদের অবস্থা খুব খারাপের দিকে যাবে। আমরা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের হারিয়ে ফেলব। অবস্থা ভালো হলে অন্তত তিন বছর বিদেশি পোশাক দেশে আমদানি না করার দাবি জানান তিনি।
দেশে মোট উদ্যোক্তার ৩২ শতাংশ নারী। একটি দেশের উদ্যোক্তাদের মধ্যে কত জন নারী এই হিসাবে ৫৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৬। আর বিশ্ব ব্যাংক গ্রুপের ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) তথ্য মতে দেশে ২৩ লাখ নারী উদ্যোক্তা আছেন। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক তথ্য মতে ২ কোটি নারী উদ্যোক্তা জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন। সমাজের দুস্থ ও বেকার নারী আজ উদ্যোক্তা হিসেবে সফল। তাই নারী উদ্যোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হলে নারী ক্ষমতায়ন ও দেশের অর্থনীতিতে যে অগ্রগতি সাধিত হয়েছে তাতে বড়ো আঘাত হানবে।
বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট সঙ্গীতা আহমেদ বলেন, ৫ লাখ টাকা মূলধনের ক্ষুদ্র ও ৩০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা মূলধনের মাঝারি ও বৃহত্ উদ্যোক্তা সদস্য আছে আমাদের। এদের মধ্যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা বেশি। আর এরা বেশির ভাগ ঢাকার বাইরে। তারা অনেক নারীর কর্মসংস্থানও করেছেন। তারা মৌসুমি ব্যবসায়ী , পহেলা বৈশাখ না ধরতে পারায় তারা বিপাকে পড়েছেন। বৈশাখের পণ্য অন্য সময় বিক্রি হবে না। আবার আগামী বছরের জন্য রেখে দেবে সেই গুদাম ব্যবস্থা তাদের নেই। ঈদও পাবে না। তাই আগে উদ্যোক্তাকে বাঁচাতে হবে। তিনি জানান, ২০০১ সালে ১৪ জন সদস্য নিয়ে শুরু করা উইমেন চেম্বার অ্যান্ড কমার্সের বর্তমানে ১৫ হাজার সদস্য আছেন। ২০ বছরে নারী উদ্যোক্তারা একটি শক্ত অবস্থানে ছিলেন, যা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি সংসদ সদস্য সেলিমা আহমাদ ইত্তেফাককে বলেন, ফ্যাশন হাউজ, বুটিকস, বিউটিফিকেশন এবং ক্যাটারিংয়ের ব্যবসায় বেশির ভাগ নারী জড়িত। তাদের পুঁজি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা। সেভিংসও থাকে না। দুই ঈদ আর বর্ষবরণ মূল লক্ষ্য। বাকি সময়টা তেমন বিক্রি থাকে না। বর্ষবরণকে কেন্দ্র করে তিন-চার মাস আগে থেকে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। যার পুরোটাই ভেস্তে গেল। রোজা কিংবা সামনের দুই ঈদে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশাতে জল ঠেলেছে করোনা। এ অবস্থায় কর্মচারীদের বেতন বাসাভাড়া গুনতে হচ্ছে। মোট ক্ষতির হিসাব আমরা এখনো শেষ করতে পারিনি। তবে বর্ষবরণে হাজার কোটি টাকার ব্যবসায় নারীদেরও ভালো অংশগ্রহণ থাকে। তাই ছয় মাসের ভ্যাট-ট্যাক্স মওকুফ, ছয় মাসের জন্য সুদবিহীন ঋণ এবং ছয় মাস বাড়িভাড়া না নেওয়ার ব্যবস্থা করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি করেন তিনি। তা না হলে ঝরে যাবে অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি নারী উদ্যোক্তা।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সিনিয়র গবেষক ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, সরকার এ সময়ে ঋণের সুদে ভর্তুকি দেওয়ার কথা বলেছে। বৈশাখের জন্য ঋণ নিয়ে যারা বিনিয়োগ করেছেন তাদের চক্রবৃদ্ধি সুদে ৪ থেকে ৫ শতাংশ সুদ ভর্তুকি সরকার দিতে পরে। কেনা কাটার অবস্থা এখন নেই। কিন্তু কিছু না কিছু জরুরি প্রয়োজন আমাদের হচ্ছে। তাই আপত্কালীন সময়ে কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলে সীমিত আকারে অনলাইন বিক্রি চালু করার পরামর্শ দেন তিনি। রোজাকে সামনে রেখে এই পণ্য দোকান থেকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার জন্য পাঠাও-এর মতো কার্যক্রমের অনুমতি দিতে বলেন তিনি ।
