মাত্র চার মাস আগেও বিশ্ববাসী আজকের এই পৃথিবী সম্পর্কে বিন্দুমাত্র আঁচ করতে পারেনি। এই কয়েক দিনেই বিশ্ববাসী দেখে নিয়েছে পৃথিবীর অন্য এক রূপ; যেখানে নেই কোলাহল, নেই হাসি-আনন্দ কিংবা উত্সবের রং। থমকে গেছে গোটা পৃথিবী; একসঙ্গে ২৩০ কোটির বেশি মানুষ একপ্রকার গৃহবন্দি। এর আগে কখনো দীর্ঘদিন এই বিপুলসংখ্যক মানুষ স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি থাকতে বাধ্য হয়নি। করোনা ভাইরাস নামের এক অদৃশ্য ভাইরাসের আক্রমণে তছনছ হয়ে গেছে একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বব্যবস্থা।
এই অবস্থা থেকে কখন মুক্তি মিলবে তার কোনো সুস্পষ্ট ধারণা কেউ দিতে পারছে না। কিন্তু করোনা ভাইরাস-পরবর্তী বিশ্ব সম্পর্কে যেসব বিশেষজ্ঞ ও ফিউচারোলজিস্ট এরই মধ্যে কথাবার্তা বলতে শুরু করেছেন, তারা সবাই একটা বিষয়ে একমত—এই পৃথিবী আর আগের মতো নেই। আর গত কয়েক মাসে যা ঘটেছে, তার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। এই মহামারি কত দিনে শেষ হবে, এখন পর্যন্ত তারও কোনো ধারণাই নেই কারো। তবে এটুকু এখন অনুমান করা যাচ্ছে যে এই মহামারির পর পালটে যাবে আমাদের কাজ—প্রাত্যহিক জীবন-ভ্রমণ-বিনোদন থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য-অর্থনীতি-সমাজব্যবস্থ্য-রাষ্ট্রব্যবস্থাসহ সবকিছু।
বিশেষজ্ঞরা করোনা ভাইরাস-পরবর্তী বিশ্ব সম্পর্কে এখন পর্যন্ত যেসব ধারণা দিয়েছেন তাতেই চমকে উঠতে হয়। এমনই একটি ধারণা গণনজরদারির রাষ্ট্র :
করোনা ভাইরাস-পরবর্তী বিশ্ব সম্পর্কে গত কিছুদিন ধরে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে ইয়োভাল নোয়া হারারির বক্তব্য। সম্প্রতি বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে এবং ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসে প্রকাশিত এক লেখায় তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে এই মহামারির পর এমন এক গণনজরদারির রাষ্ট্রব্যবস্থার উদ্ভব হতে পারে, যেখানে সরকার প্রত্যেক নাগরিকের প্রতিটি মুহূর্তের চলাফেরা শুধু নয়, তার আবেগ-অনুভূতি, পছন্দ-অপছন্দের খবরও জেনে যাবে।
খুব সংক্ষেপে তার ভাবনাটা এরকম—এই মহামারির সময়ে যেসব স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, সেগুলো পরে পাকাপাকি ব্যবস্থা হয়ে দাঁড়াতে পারে। আর সেই পথ ধরে উত্থান ঘটতে পারে স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার, যেখানে চলবে গণনজরদারি। অন্যদিকে বিশ্বায়নের পরিবর্তে জাতীয়তাবাদী একলা চলো নীতি অনুসরণ করবে অনেক রাষ্ট্র।
গণনজরদারি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা শুরু হবে মহামারি মোকাবিলার নামে মানুষের চামড়ার নিচে কোনো মাইক্রোচিপ ঢুকিয়ে দিয়ে বা ট্র্যাকিংয়ের জন্য হাতে বেড়ি পরিয়ে। সরকার হয়তো বলবে, যারা নিয়ম ভাঙবে, তাদের শাস্তির জন্য এই ব্যবস্থা। কিন্তু বাস্তবে এটি পুরো জনগোষ্ঠীর ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারিতে কাজে লাগবে।
এখন এমন প্রযুক্তি এসে গেছে, যা দিয়ে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের প্রতিমুহূর্তের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। মহামারি ঠেকানোর নামে কিছু কিছু দেশ এরই মধ্যে এরকম কাজ শুরু করে দিয়েছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে চীন। সেখানে সব মানুষের স্মার্টফোন মনিটর করা হচ্ছে। চেহারা চিনতে পারে এরকম লাখ লাখ ক্যামেরা দিয়েও নজর রাখা হচ্ছে মানুষের ওপর। লোকজনকে তাদের শরীরের তাপমাত্রা মাপা, স্বাস্থ্য সম্পর্কিত তথ্য শেয়ার করতে বাধ্য করা হচ্ছে। ফলে কর্তৃপক্ষ খুব দ্রুত শনাক্ত করতে পারছে কে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। শুধু তাই নয়, তার সংস্পর্শে এসেছিল এমন লোকদেরও দ্রুত খুঁজে বের করা হচ্ছে। কিন্তু আশঙ্কার কথা, পরের ধাপেই এই নজরদারি চলে যেতে পারে আরো নিবিড় পর্যায়ে।
এর মধ্য দিয়ে একজন তার স্বাধীনতা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলতে পারেন। সারাক্ষণ রাষ্ট্রের নজরবন্দি হয়ে থাকতে হবে। কে কোন ওয়েবসাইটে যাচ্ছে, কোন নিউজ লিংকে ক্লিক করছে, কোন ভিডিও দেখছে, সেটা দেখে তার রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত রুচি ও ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে নজরদারি করতে পারবে রাষ্ট্র। এমনকি কোনো ভিডিও দেখার সময় কিংবা কোনো নিউজ দেখার সময় শরীরের তাপমাত্রা, রক্তচাপ, হূত্কম্পনের তারতম্য, হাসি-কান্না বিশ্লেষণ করে মনোজগতেও নজরদারি করতে পারবে রাষ্ট্র।
অর্থনীতি : ভয়াবহ বিশ্বমন্দা
করোনা ভাইরাস মহামারি-পরবর্তী বিশ্বে অর্থনীতির অবস্থা কী দাঁড়াবে, সেটা নিয়েই সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা। অনেকের ধারণা, মহামারি হয়তো নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে, কিন্তু এটা করতে গিয়ে বিশ্ব অর্থনীতির যে মারাত্মক ক্ষতি এর মধ্যে হয়ে গেছে, তা কাটাতে বহু বছর লেগে যাবে। মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকে বিশ্বের প্রায় সব প্রধান অর্থনীতিতে বিরাট ধস নেমেছে, যেটাকে বলা হচ্ছে ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের চাইতেও ভয়াবহ। কেউ কেউ বলছে, ১৯৩০-এর দশকে যে বিশ্ব মহামন্দার সূচনা হয়েছিল, এবারের অর্থনৈতিক সংকট সেটাকেও ছাড়িয়ে যাবে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের এক সতর্ক বার্তায় বলা হয়েছে, এ বছর বিশ্ব অর্থনীতি সংকুচিত হবে ৩ শতাংশ। যদি মহামারি দীর্ঘায়িত হয়, বিশ্ব জুড়ে বিভিন্ন দেশের সরকার আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো পরিস্থিতি সামলাতে গিয়ে অগ্নিপরীক্ষার মুখে পড়বে। আর ধনী দেশগুলোর অর্থনীতি ২০২২ সালের আগে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা যাবে না।
ব্রিটেনের ইউনিভার্সিটি অব সারে?র গবেষক সাইমন মেয়ার বলছেন, আগের অর্থনৈতিক সংকটগুলোর সঙ্গে এবারের সংকটের একটা বড়ো তফাত আছে। যখন অর্থনীতিতে এরকম সংকট তৈরি হয়, তখন সরকার নিজেই বেশি করে অর্থ খরচ করতে শুরু করে, যাতে মানুষের পকেটে টাকা যায় এবং লোকে বেশি করে জিনিসপত্র কেনা শুরু করে। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙ্গা হয়, মন্দা কাটতে শুরু করে। জন মেনার্ড কিনসের এই অর্থনৈতিক তত্ত্বের সফল প্রয়োগ অতীতে অনেক মন্দার সময় করা হয়েছে। কিন্তু এবারের সংকটের কারণটাই হচ্ছে সরকার নিজেই লকডাউনের মাধ্যমে সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দিয়েছে। অর্থাত্ সরকারের নীতির লক্ষ্যই হচ্ছে অর্থনীতিকে আপাতত নির্জীব রাখা। এর থেকে বের হওয়ার উপায় কী? সাইমন মেয়ারের মতে, এই সংকট মোকাবিলায় অনেক দেশের সরকার যে অর্থনৈতিক নীতি নিচ্ছে, তাকে ‘রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ??’ বলা যেতে পারে। ব্রিটেনে লকডাউনের সময় লোকজনকে যেন কাজ থেকে ছাঁটাই করা না হয়, সেজন্য তাদের বেতনের ৮০ শতাংশ পর্যন্ত সরকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
বিশ্বায়নের পরিবর্তে জাতীয়তাবাদ?
ইতিহাসবিদ ইয়োভাল হারারির মতে, করোনা ভাইরাস-পরবর্তী বিশ্বে আরেকটি বড়ো প্রবণতা হবে কট্টর জাতীয়তাবাদের উত্থান। প্রতিটি রাষ্ট্র অন্যের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিয়ে নিজেকে সুরক্ষিত করতে চাইবে। এরই মধ্যে এরকম ঘটনা অনেক ঘটেছে। ইতালি তো সরাসরি অভিযোগ করেছে, তার দুর্যোগের দিনে অন্য ইউরোপীয় দেশগুলো পাশে দাঁড়ায়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথায়ও তেমন সুর। ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট?’ এবং একলা চলো নীতি এই সংকটের সময় আরো স্পষ্ট হয়েছে। জার্মানির একটি কোম্পানির কাছ থেকে তিনি করোনা ভাইরাসের একটি ‘টেস্ট কেবল’ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কিনে নেওয়ার যে চেষ্টা করেছেন, সেটি ইউরোপের সঙ্গে তার সম্পর্কে আরো টানাপোড়েন তৈরি করেছে। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক স্টিফেন এম ওয়াল্টি ‘ফরেন পলিসি?’তে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলছেন, এই মহামারি এরকম জাতীয়তাবাদকে আরো উসকে দেবে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, কোভিড নাইনটিন-পরবর্তী বিশ্ব হবে আগের চেয়ে কম খোলামেলা, কম সমৃদ্ধ এবং কম স্বাধীন।—বিবিসি
