আমাদের সম্মিলিত উদ্যোগ শুধু মাস্ক পরা নয়

আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০২০, ১৭:৫৫

আমরা যারা নব্বই-পরবর্তী গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে জন্ম নিয়েছি, বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে তাদের সজ্ঞান চোখ নিঃসন্দেহে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপের অভিজ্ঞতা নিচ্ছে। খুব সম্ভবত এই প্রথমবার সারা পৃথিবী একই রোগে ভুগছে। একটি অনিশ্চিত, অন্ধকারাচ্ছন্ন সময় পার করছে গোটা মানবজাতি। প্রশ্ন অনেক, কিন্তু অধিকাংশেরই উত্তর এখনও অজানা। এরকম একটি ক্রান্তিকাল মোকাবিলা করার জন্য যে হাতিয়ারগুলো সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি হচ্ছে সম্মিলিত উদ্যোগ (Collective Action)। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, দুনিয়ার বিভিন্ন স্থানসহ বাংলাদেশেও আমরা সম্মিলিতভাবে উদ্যোগী হয়ে উঠতে পারিনি। যা হয়তো আমাদের একটি মারাত্মক ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

সম্মিলিত উদ্যোগ শব্দ দুটি শুনেই বুঝা যাচ্ছে, এটি কোনো ব্যক্তিগত ব্যাপার নয়। বিভিন্ন পেশা, ক্ষেত্র, বয়স, শ্রেণি ইত্যাদির মানুষ সমন্বিতভাবে যখন এমন কোনো কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকে যা তাদের সকলের জন্য সুফল বয়ে আনার সম্ভাবনা প্রদর্শন করে, তখন সেটিকে সম্মিলিত উদ্যোগ বা প্রচেষ্টা বলা যেতে পারে। যেহেতু মানুষ সামাজিক জীব, সেহেতু দৈনন্দিন জীবনের নানা ক্ষেত্রে আমরা ছোট থেকে বড় বিভিন্ন পর্যায়ের সম্মিলিত উদ্যোগের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাই। কিন্তু কোভিড-১৯ এর এই মহামারি পরিস্থিতিতে যে মাত্রার এবং যে ধরনের সম্মিলিত উদ্যোগ আমাদের দরকার ছিল তার ধারে কাছেও আমরা নেই বলেই আমার অভিমত। আমি এখানে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগ সম্পর্কে কিছু কথা বলতে চাই তবে উল্লেখ্য, কোভিড-১৯ এমনই একটি জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে যে এ বিষয় নিয়ে যেসকল সরকারি-বেসরকারি সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান কাজ করছে তাদের সকলের মধ্যেই সম্মিলিত উদ্যোগ ও সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে।

গত ১৮ই মার্চ থেকে আব্বা-আম্মার নির্দেশে আমি এবং আমার ছোটভাই প্রায় গৃহবন্দী। এরপর থেকে বিভিন্ন জরুরি প্রয়োজনে ঘর থেকে ৪-৫ বারের মত বের হয়েছি। প্রত্যেকবারই ভেবেছিলাম আজকে হয়তো রাস্তায় এত মানুষ দেখা যাবে না, আজকে হয়তো সচেতনতার অনেক দৃশ্য আমার চোখে পড়বে। কিন্তু দুঃখজনক ভাবে আমি প্রতিবার হতাশ হয়েছি। পাড়ার গলিগুলোতে এখনও মানুষ অকারণ আড্ডা দিচ্ছে, চা-সিগারেট খাচ্ছে, গল্পগুজব করছে। বাজারগুলোতে শারীরিক দূরত্ব মেনে চলায় নেই কোনো দায়বোধ, আগের মতই গায়ে গা ঘেঁষে ঘেঁষে আমরা বাজার করছি। আমার বাসস্থানের পাশের বাড়িতেই চলছে নতুন একটি পাকা ঘর নির্মাণের কাজ, যেখানে প্রায় কোনো ধরনের সুরক্ষা ছাড়াই কাজ করছেন ৫-৬ জন নির্মাণ শ্রমিক। এছাড়াও সংবাদমাধ্যমের নিয়মিত প্রতিবেদনগুলোতে অসচেতনতার এত বহুবিধ চিত্র চোখে পড়ছে যে সেগুলোর তালিকা করাও একটি দুরূহ কাজে পরিণত হয়েছে। এতকিছুর মধ্যে শুধু একটি জায়গাতেই আমরা সম্মিলিত একটি সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছি, মাস্ক পরা। আমরা ভাবছি শুধু মাস্ক পরলেই আমরা নিরাপদ; মাস্ক পরলেই আমরা গলির মুখে আড্ডা দিতে পারব, একসাথে তাস খেলতে পারব, একজনের ঘাড়ের উপর দিয়ে আরেকজন বাজার করতে পারব এবং নানা অজুহাতে বের হতে পারব বাড়ির বাইরে। পুরো পৃথিবীতে হাজার হাজার মৃত্যুর পরও আমরা পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবন করতে পারিনি বা জনগণকে ভয়াবহতার মাত্রা বুঝাতে সক্ষম হইনি। ফলস্বরূপ আমরা শুধু নিজেরা নই, নিজেদের পরিবার এবং সম্পূর্ণ দেশকে দাড় করিয়েছি এক ভয়ংকর সংকটের মুখোমুখি। এই সংকটের স্বরূপ এমনই যে, এর আওতামুক্ত নয় কোনো গোষ্ঠী, কোনো শ্রেণি, কোনো ব্যক্তি।

সম্মিলিত উদ্যোগের প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে “ফ্রি রাইডিং”, যার মানে হচ্ছে নিষ্ক্রিয় থেকে সুবিধাভোগ করা। যেমন ধরুন, আমরা সকলেই যদি পরিমিতভাবে পানি ব্যবহার করি তাহলে হয়তো অন্যদের পানির কষ্টে ভুগতে হবে না। কিন্তু আমরা প্রত্যেকেই বিষয়টি অন্যের উপর ছেড়ে দেই, ভাবি আমি না করলেও অন্যরা করবে, পানি সংকটের পিছনে আমার অবদান অত্যন্ত নগণ্য, তাই আমি একটু অপচয় করলেই কি আর না করলেই কি। অর্থাৎ আমরা অন্যের ঘাড়ে চেপে বৈতরণী পার হবার চেষ্টা করি। কিন্তু আমরা প্রত্যেকেই যখন একই চিন্তা করি তখন আমাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অপচয় বৃহৎ আকার ধারণ করে, ফলে যারা পানি ব্যবহারে মিতব্যয়ী হন তাদের অবদান মাঠে মারা যায়। যেকোনো আন্দোলনেও আমরা এরকম “ফ্রি রাইডিং” দেখতে পাই যেখানে অনেকেই সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে অংশ না নিয়ে নিষ্ক্রিয় থেকে তার সুফল ভোগ করতে চান। এবং অনেক ক্ষেত্রেই এই সকল “ফ্রি রাইডার” বা নিষ্ক্রিয় সুবিধাভোগীরা অন্যদের সক্রিয় অবদানের বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করে থাকেন।

কিন্তু করোনার সাথে আমরা সম্মিলিত উদ্যোগের অন্যান্য উদাহরণগুলোকে কোনোভাবেই মেলাতে পারব না। কারণ এখানে নিষ্ক্রিয় থেকে সুবিধাভোগের সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। কেউ যদি মনে করেন আমি একা বাড়ি থেকে বের হলে কিছুই হবে না, তাহলে তিনি একটি ভীষণ ভুল করে ফেলবেন। কারণ অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রে “ফ্রি রাইডিং” এর নেতিবাচক প্রভাব প্রত্যক্ষভাবে নিজের উপর না পড়লেও এখানে কিন্তু কেউই করোনার হাত থেকে নিশ্চিতভাবে সুরক্ষিত নন। যারা সামান্য কারণে বা অকারণে বাড়ি থেকে বের হচ্ছেন এবং নিজের বাড়িতে অন্যদের ডেকে আনছেন; বিভিন্ন জায়গায় আড্ডা দিচ্ছেন, জমায়েত করছেন; কোনো ধরনের শারীরিক দূরত্ব বা সতর্কতার ধার ধারছেন না তারা কিন্তু অজান্তেই নিজের, নিজের পরিবারের এবং অন্যদের বিপদ ডেকে আনছেন। এটি এমনই এক পরিস্থিতি যেখানে একটি অসচেতন মস্তিষ্ক, একটি অসচেতন কাজ ভেস্তে দিতে পারে অন্যদের সকল সচেতন প্রয়াস। কোভিড-১৯ একটি মারাত্মক সংক্রামক রোগ, পরিবারের একজন ব্যক্তিও যদি অসতর্ক হয়ে থাকেন তবে আক্রান্ত হতে পারে পুরো পরিবার। ঠিক তেমনি পাড়ার একজনের খামখেয়ালিপনা আক্রান্ত করবে সারা পাড়া এবং পর্যায়ক্রমে সারা দেশ।

এই হতাশাজনক অবস্থার মধ্যেও  বিভিন্ন সম্মিলিত উদ্যোগের সফল খবর আমাদের অনুপ্রাণিত করছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় মানুষ দেখিয়ে দিচ্ছে কিভাবে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় একসাথে কাজ করতে হবে। বান্দরবানে ম্রো সম্প্রদায় করোনাভাইরাসকে ঠেকাতে নিজেদের পাড়াগুলোকে নিজেরাই অবরুদ্ধ করে ফেলেছেন এবং বহিরাগতদের প্রবেশ একেবারে নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন। সারা ঢাকা যখন করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে তখন কল্যাণপুর হাউজিং এস্টেটের বাসিন্দারা নিজেদের উদ্যোগে তাদের এলাকায় জীবাণুনাশক ছিটাচ্ছেন, মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রিত রাখছেন, এমনকি শারীরিক দূরত্ব মেনে বিভিন্ন বৈঠক পর্যন্ত করছেন। আমি নিশ্চিত এরকম অনেক উদ্যোগ আমাদের দৃষ্টির অগোচরে বহু মানুষকে নিরাপদ রাখছে। এগুলো সফল হওয়ার পিছনের কারণগুলো হচ্ছে সদিচ্ছা, শক্তিশালী সামাজিক যোগাযোগ এবং স্থানীয় বা লোকালয় ভিত্তিক কর্তৃপক্ষের কার্যকরী পদক্ষেপ। সত্যিকার অর্থে, কোনো একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মানুষের সংখ্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। মানুষের সংখ্যা যত বাড়তে থাকবে একটি সম্মিলিত উদ্যোগে ঐক্যমতে পৌঁছানো ও উদ্যোগটিকে কার্যকর করার প্রক্রিয়াও তত কঠিন হতে থাকবে। সফল সম্মিলিত উদ্যোগের জন্য তাই দরকার ছোট ছোট দল তৈরি করা, যা একটি নির্দিষ্ট দলের সদস্যদের মধ্যকার সমন্বয় এবং দলগুলোর পারস্পরিক সমন্বয়কে সহজতর করে তুলবে। আমরা যদি পাড়া, মহল্লা, গলি এমনকি পারিবারিক পর্যায়ে আমাদের কর্মকাণ্ডগুলোকে শক্তিশালী সামাজিক যোগাযোগ এবং লোকালয় ভিত্তিক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত রাখতে পারি তবে আমাদের সম্মিলিত উদ্যোগগুলো হয়তো এই ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়ার গতিকে রুখতে পারবে এবং বাঁচাতে পারবে শত শত প্রাণ। আমাদের দেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা রাতদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন আমাদের নিরাপদ রাখতে। কিন্তু আমরা নিজেরা যদি সচেতন না হই তাহলে তাদের এই পরিশ্রম কোনো কাজেই আসবে না। উল্টোদিকে তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমরা যদি তাদের সহযোগিতা করি তবে তাদের এবং আমাদের সম্মিলিত উদ্যোগ মিলে তৈরি হবে একটি প্রতিরোধের দেয়াল, যা দিয়ে আমরা প্রতিহত করতে পারব কোভিড-১৯ নামক এই মহামারি।

আমরা সম্মিলিতভাবে মাস্ক পরছি, যেটি নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ। কিন্তু আমাদের সম্মিলিত উদ্যোগের ব্যাপ্তি যদি শুধুমাত্র মাস্ক পরায় সীমাবদ্ধ থাকে তবে আমরা কোনোক্রমেই এই মহামারিকে আটকে রাখতে পারব না। বিশেষ করে আমাদের মত দেশ যেখানে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত জনবল এবং যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতা রয়েছে এবং যেখানে জনবসতি এত ঘন সেখানে জনগণ, রাষ্ট্র এবং আনুষঙ্গিক ক্ষেত্রগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ ব্যতীত এরকম একটি সংকটাপন্ন সময় কাটিয়ে ওঠা বলতে গেলে প্রায় অসম্ভব একটি ব্যাপার। আমাদের ঘাটতি অনেক এবং ইতিমধ্যে বেশ দেরীও হয়ে গিয়েছে। তবু আমরা সাধারণ জনগণ যদি সম্মিলিতভাবে এই ভাইরাসকে রুখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হই তবে হয়তো এই প্রতিকূল সময় আমরা জয় করতে পারব, উতরে যেতে পারব এই কঠিন পরীক্ষা।

আমাদের সম্মিলিত উদ্যোগ শুধু মাস্ক পড়া নয়: জাহিদ নূর

লেখক: ছাত্র ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা

ইত্তেফাক/আরএ