পিরোজপুরের উত্তরাঞ্চলের কান্দিবেড় পদ্ধতির শীতকালীন শাকসবজি চাষের এখন ভরা মৌসুম চলছে। বিল এলাকার শতবর্ষের প্রাচীন জনপ্রিয় এ কৃষি পদ্ধতিটি গত কয়েক বছরে নতুন নতুন জমিতে সম্প্রসারিত হচ্ছে। তবে শৈত্যপ্রবাহ ও ঘন কুয়াশার কবলে পড়ে এ বছরও এ চাষ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। কৃষকদের ধারণা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কয়েক বছর ধরে তারা এই পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন।
জেলার নাজিরপুর উপজেলার দেউলবাড়ি দোবরা ও কলারদোয়ানীয়া, দীর্ঘা ও মালিখালী এবং পার্শ্ববর্তী বানারীপাড়ার বিশারকান্দি ও ইলুহার এবং স্বরূপকাঠির (নেছারাবাদ) বলদিয়া ইউনিয়নে কয়েক বছর ধরে কান্দিবেড় পদ্ধতিতে শাকসবজি চাষ প্রচলিত। নাজিরপুর উপজেলার চারটি ইউনিয়নেই ১০১০ হেক্টর জমিতে ১৮১৮০টি কান্দিতে ২৩ রকমের শাকসবজি চাষ হয় রবি ও খরিপ মৌসুমে। যার মধ্যে নভেম্বর মাস থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত মিষ্টি কুমড়া, চাল কুমড়া, লাউ, করল্লা, মরমা (শশা বিশেষ), আলু, বাঁধাকপি, ফুলকপি, শালগম, টমেটো, বেগুন, পেঁপে, সীম, মরিচ ইত্যাদি চাষ হয় ব্যাপকভাবে। জো-মাটির সঙ্গে পলি পড়ে গঠিত বিশেষ ধরনের ভূমিতে কান্দি বা আল কেটে চাষের বেড তৈরি হয়, মাঝে থাকে বেড় বা ড্রেন। ১০/১২ ফুট চওড়া এবং নানা আকারের দৈর্ঘ্য। এসব কান্দিতে শীত মৌসুমে কৃষকরা নানা জাতের শাকসবজি, মসলা ও আঁখ চাষ করে।
দেউলবাড়ি দোবরা ইউনিয়নের বিল ডুমরিয়া গ্রামের ধনী কৃষক হাজী শাহাবুদ্দিন বাহাদুর জানান, তার মালিকানায় ১০০ রশি (এক রশি সমান ১৮০ ফুট) কান্দি বেড় রয়েছে। যার সংখ্যা দেড় শতাধিক। তিনি নিজে ১৬টি কান্দি চাষে রেখে বাকিগুলো বার্ষিক নগদ খাজনায় লিজ দিয়েছেন। ১৬টি কান্দিতে ১১ রকমের শাকসবজি চাষ করেছেন। যেখানে তার বিনিয়োগ লক্ষাধিক টাকা।
মুগারঝোর গ্রামের কৃষক সংগঠক আক্তার হোসেন জানান, এ মৌসুমে কান্দিবেড় পদ্ধতির চাষ মোটামুটি ভালো। দেউলবাড়ী-দোবরা ইউনিয়নের মনোহরপুর, বিলডুমরিয়া, বাদোখালী, তুরুকখালীসহ সন্নিহিত জলাভূমিতে কৃষকরা নতুন নতুন এলাকায় এ পদ্ধতির চাষ বাড়াচ্ছেন। জমিতে লোনা পানির প্রবেশ ঠেকাতে স্থানীয়ভাবে ছোট ছোট বেড়িবাঁধ দেওয়ার ফলে কচুরিপানা, নলখাগড়া, হোগলা ইত্যাদি উদ্ভিদ আকীর্ণ নিচু জমি কান্দিবেড়ে রূপান্তরিত করে ব্যাপকভাবে এ চাষের সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
মনোহরপুরের বাচ্চু মিয়া গত দুই বছরে অন্তত প্রায় পাঁচ একর জমি কান্দিবেড় পদ্ধতির আওতায় এনেছেন। এ রকম আরো ৩০জন চাষি বর্তমানে নতুন নতুন জমিতে এ কৃষি পদ্ধতি বাড়িয়েছেন।
গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়া উপজেলার মিত্রডাঙ্গা গ্রামের বঙ্গবন্ধু কৃষি পুরস্কার পাওয়া কৃষক শক্তি কীর্তনিয়া জানান, তিনি এ বছর ২০ রশি (২০০০ হাত) কান্দিতে এ চাষ করেছেন। যা আগের তুলনায় বেশি। তার মত নিজ ইউনিয়ন গোপালপুরের অনেক চাষি কান্দিবেড় পদ্ধতির চাষ আরো বাড়িয়েছেন। এ চাষে তারা বেশ লাভবান হচ্ছেন। এদিকে নাজিরপুরের বৈঠাকাটা, গাওখালী, মনোহরপুর, বানারীপাড়ার বিশারকান্দি ইউনিয়নের চৌমুহনী ইত্যাদি বাজারে কান্দিবেড় পদ্ধতিতে উত্পাদিত কৃষিপণ্যের এখন জমজমাট বেচাকেনা। দেশের শাক-সবজির বৃহত্তম ভাসমান বাজারটি বৈঠাকাটা হাটে এ মৌসুমে শনি ও মঙ্গলবার দেখতে পাওয়া যায়। যন্ত্রচালিত ও হস্তচালিত শত শত নৌকায় এ হাট বসে।
