দেবব্রত মুখোপাধ্যায়
মানুষের ভেতরের মানুষ বের হয়ে আসার সময় এখন।
এই মহামারিকালে চেনা মানুষের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসেন দানব। তেমনই চেনা কোনো হাসিখুশি ছেলের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে এক জন যোদ্ধা।
এই আমাদের অপুর কথাই ধরুন না—নাজমুল হোসেন অপু।
ক্রিকেট দুনিয়া অপুকে চেনে ‘নাগিন ড্যান্সের’ জনক হিসেবে। ড্রেসিংরুমে সতীর্থরা তাকে চেনেন আড্ডায় মাতিয়ে রাখা এক তরুণ ক্রিকেটার হিসেবে। সমর্থকরা চেনেন এক জন কার্যকর স্পিনার হিসেবে। কিন্তু এই দুঃসময়ে অপু বল, হাসি, নাচ; সবকিছু বাক্সবন্দি করে নেমে পড়েছেন ময়দানে। নিজের হাতে তহবিল সংগ্রহ করে, নিজেই খাবারের প্যাকেট তৈরি করে সে নিয়ে ছুটছেন মানুষের দুয়ারে দুয়ারে।
অপুর বাড়ি নারায়ণগঞ্জে। ঢাকার পরই করোনা ভাইরাস সংক্রমণের সবচেয়ে বড়ো জায়গা হয়ে উঠেছে এই নারায়ণগঞ্জ। তিনি যখন সব খেলা বন্ধ হয়ে গেল, শুরুতে কিছুদিন মানুষকে সচেতন করার কাজ করেছিলেন। এরপর বুঝলেন এই সংকটে আশেপাশে অনেক মানুষের আর্থিক কষ্ট শুরু হয়েছে। সিদ্ধান্ত নিলেন তাদের পাশে দাঁড়ানোর।
সেই কাজটায় কিছু টাকা সংগ্রহ করে নিজের দায় শেষ করতে পারতেন। কিন্তু অপুর চিন্তাটা একটু অন্যরকম। তিনি লোকেদের কাছ থেকে টাকা জোগাড় করেছেন, একটা দল তৈরি করেছেন এবং নিজেই সেই কাজে নেমে পড়েন। কাজটা সম্পর্কে অপু বলছিলেন, ‘একা একা তো করা যায় না। তাই আমি একটা টিমের মতো করে নিয়েছি। যারা এই কাজ করছে, তাদের স্বাস্থ্যের ব্যাপারটাও মাথায় রাখা হয়েছে। আমরা ইউএনও স্যারের কাছ থেকে পারমিশন নিয়ে ১৫টা কার্ড করে নিয়েছি। যাতে যে কেউ এই কাজের জন্য ঘোরাঘুরি না করে।’
কিন্তু নিজে কেনো এই কাজে অংশ নিচ্ছেন? এ নিয়ে অপুর দারুণ একটা ব্যাখ্যা আছে। তিনি বলছিলেন, ‘এই রোগটায় আমি যত দূর বুঝেছি, যারা ফিট মানুষ, তাদের ভয় কম। ফলে আমরা যারা তরুণ আছি, তাদেরই এগিয়ে আসতে হবে। আমি আরেকজনকে টাকা দিয়ে ঘরে বসে থাকতে পারতাম। কিন্তু সেও তো অসুস্থ হতে পারত। তাই ভাবলাম, কিছু হলে আমার ওপর দিয়েও হোক।’
অপু নিজে এই খাতে যতদূর পারেন বিনিয়োগ করছেন। পাশাপাশি জাতীয় দলের তারকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন পরিচিত জনের থেকে সহায়তা নিচ্ছেন। সহায়তা করছেন, এমনই এক জন হলেন তামিম ইকবাল। ইতিমধ্যে দুই দফা অর্থ দেওয়া তামিমই কাল অপুর ছবি পোস্ট করে ফেসবুকে লিখেছেন এই উদ্যোগের কথা। তামিম অপুকে নিয়ে বলছিলেন, ‘এই প্রবল দুর্যোগের সময় দেশজুড়ে আরো অসংখ্য মানুষ এভাবে অসহায়দের পাশে দাঁড়িয়েছে আজ। অপুর যে দিকটি আমার খুব ভালো লেগেছে, সে উদ্যোগ নিয়েছে তো বটেই, নিজেই সবকিছু জোগাড় করে, মেপে, প্যাকেট করে, মানুষের দুয়ারে পৌঁছে দিচ্ছে। একবার-দুবার নয়, বারবার। এক জন জাতীয় ক্রিকেটার যখন এভাবে মানবসেবায় ঝাঁপিয়ে পড়েন, সমাজকে তা খুব ভালো বার্তা দেয়।’
অপুরা এক একটা পরিবারকে একবারে কমপক্ষে সাত দিনের মতো চাল-ডালসহ অন্যান্য উপকরণ পৌঁছে দিচ্ছেন। গতকাল পর্যন্ত প্রায় ৮০০ পরিবার তাদের কাছ থেকে এই সুবিধা পেয়েছে। অপুর ইচ্ছা, যতদিন এই সংকট চলবে, এভাবেই তারা কাজ চালিয়ে যাবেন।
এই সাধারণ মানুষ নিয়েই এখন অপুর সংসার।
