ড. মো. নাছিম আখতার
করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচতে সমগ্র পৃথিবী আজ সচেষ্ট। সবাই কমবেশি ঘরে আবদ্ধ। এখন পর্যন্ত পৃথিবীতে দুই মিলিয়নের বেশি মানুষ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত এবং মৃত্যু অনেক আগেই লাখ অতিক্রম করেছে। প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। ভাইরাসটির বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ বা প্রতিষেধক টিকা নেই। সচেতনতাই এর থেকে মুক্তির একমাত্র উপায়।
২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে চীনে হুবেই প্রদেশে উহান শহরে মানব দেহে ভাইরাসটির সর্বপ্রথম প্রাদুর্ভাব ঘটে। এখন সারা বিশ্বে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছে। আমাদের দেশে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে গত ৮ই মার্চ ২০২০ ইং তারিখে। এরপরে এই ছোঁয়াচে রোগটি প্রতিরোধে শুরু হয়েছে গণমাধ্যমের প্রচার-প্রচারণা। কীভাবে রোগটিকে প্রতিরোধ করা যায়, এর একটি গাইড লাইন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্ববাসীকে জানিয়েছে। গাইড লাইনের মধ্যে আছে—ঘন ঘন সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, নিরাপদ দূরত্ব (তিন ফিটের চেয়ে কিছু বেশি) বজায় রেখে চলাফেরা করা, মাস্ক পরিধান, পুষ্টিকর খাবার ও পানি পান এবং সঙ্গনিরোধ। নিয়মগুলো মেনে চললে করোনা নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
সামাজিক এই বঞ্চনা থেকে পরিত্রাণ পেতে আমাদের মানসিক পরিবর্তন খুবই জরুরি। এই পরিবর্তন না ঘটলে করোনা যতটা না মহামারি তার চাইতে বড়ো মানসিক সমস্যা হিসেবে দেখা দেবে। কেন এই সামাজিক প্রবঞ্চনা? আমার মতে, আমাদের মধ্যে রয়েছে জ্ঞান, সঠিক উপলব্ধি ও বাস্তব ভিত্তিতে বিচার-বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা ও সহমর্মিতার অভাব। তাছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় কাটানোর কারণে ইতিবাচক-নেতিবাচক উভয় ধরনের খবর ও ভিডিও আমাদের মনের এত গভীরে প্রবেশ করছে যে, আমরা হয়ে পড়ছি প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত সতর্ক। যাকে এক কথায় বলে আতঙ্ক। উপরোল্লিখিত আমার পরিচিত তাবলিগফেরত দুই ছেলের করোনা টেস্টের রিপোর্ট দিতে আসা সরকারি স্বাস্থ্যকর্মীদের পিপিই পরিহিত বেশে আগমন ও রোগীর নামধাম জিজ্ঞাসা করার মুহূর্তটি কোনো একজন এমনভাবে মোবাইলে ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপলোড করেছে যে, দেখে মনে হয় আমার বসবাসের এলাকা করোনার আগ্রাসী থাবায় জর্জরিত। ভিডিও ধারণকারী তো মনে মনে তৃপ্ত এই ভেবে যে, বিশাল একটি ঘটনা সে জনসম্মুখে তুলে ধরতে পেরেছে। কিন্তু এই ভিডিও দেখার পর দুর্বল চিত্তের কত মানুষ যে আতঙ্কে বিনিদ্র রজনী পার করেছে তার হিসাব কি ঐ ভিডিও ধারণকারী রেখেছে?
করোনাকে জয় করতে স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি দরকার একে অন্যের প্রতি সহমর্মিতা। একটি বিষয় ভাবুন তো! যদি যুক্তরাষ্ট্রের মতো আমাদের দেশে করোনা আক্রান্ত রোগী সাত লাখ ছাড়ায়, সে ক্ষেত্রে এত মানুষকে কোথায় আইসোলেশনে রাখবেন? তাদেরকে তাদের বাসাতে আইসোলেশনের ব্যবস্থা করতে হবে, তাই নয় কি? এক্ষেত্রে শুধু সচেতন থাকতে হবে রোগাক্রান্ত মানুষগুলো যেন সুস্থ মানুষের সংস্পর্শ থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকে। তথ্যমতে করোনা মৃদু উপসর্গসহ ৮০ শতাংশ মানুষের মাঝে দেখা দেয়। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কারণে বিশ্রাম নিলে এমনিতেই তা সেরে যায়। এমতাবস্থায়, সবাইকে যদি আমরা দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়ে সমাজচ্যুত করি অথবা হাসপাতালে পাঠাতে চাই তাহলে সংকটাপন্ন রোগীদের কোথায় চিকিত্সা হবে? স্বাস্থ বুলেটিনের তথ্যমতে দেশে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ২ হাজারের বেশি। এদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ বাসায় চিকিত্সা নিচ্ছেন। সুতরাং উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আমাদের সবাইকে সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।
পত্রপত্রিকায় দেখেছি করোনা ভাইরাসের কারণে স্ত্রীকে স্বামী-সন্তান জঙ্গলে ফেলে যাচ্ছে, বৃদ্ধ স্বামীকে স্ত্রী-সন্তান ত্যাগ করছে। প্রতি ক্ষেত্রেই সহানুভূতি ও সহমর্মিতার অভাব। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের নিমিত্তে আমাদের হতে হবে ধৈর্যশীল। জাগ্রত করতে হবে নিজের বিবেককে। মনে রাখতে হবে আমরা মানুষ ‘সৃষ্টির সেরা জীব’। তবেই আমরা জয়ী হব অণুজীব করোনার বিরুদ্ধে।
n লেখক : অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর
