কামরুল হাসান কামু
বিগত সময়ে কৃষিতে এক নীরব বিপ্লব ঘটেছে। উত্পাদন বৃদ্ধি পেয়েছে পাল্লা দিয়ে। করোনা ভাইরাসজনিত কারণে সৃষ্ট হয়েছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা যার প্রভাব প্রত্যক্ষভাবে পড়েছে বাংলাদেশের ওপর। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মাইলফলকের ভূমিকা রাখত পোশাকশিল্প ও রেমিট্যান্স। এই দুইটি খাত এখন বিপর্যস্ত। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অধিকাংশ রপ্তানি হতো ইউরোপ ও আমেরিকায়। করোনা ভাইরাসের প্রকট প্রভাবে ঐ সমস্ত দেশ এখন পুরোপুরি অবরুদ্ধ। লকডাউনে ডাউন হয়েছে সেসব দেশের পোশাক আমদানি যার ঋণাত্মক প্রভাব পড়েছে আমাদের পোশাক শিল্পে। অর্থনীতি আজ অবরুদ্ধ। কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে কে জানে?
অন্যদিকে করোনা ভাইরাসজনিত উদ্বেগে আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধারা দেশে চলে এসেছে যার প্রভাব পড়েছে অর্থনীতির ওপর। যে সমস্ত দেশ থেকে প্রবাসীরা চলে এসেছে সেসব দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে দীর্ঘসময় লাগতে পারে। তাছাড়া অর্থনীতির মানদণ্ড ঠিক রাখতে কর্মী ছাঁটাই করবে অনেক দেশের বহু প্রতিষ্ঠান; ফলে বেকার হয়ে পড়বে অনেক প্রবাসী। সুতরাং আমাদের পুরোপুরিভাবে মনোযোগ দিতে হবে কৃষিতে। ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর মুখে খাবার তুলে দিতে না পারলে যে ভয়াবহতার সৃষ্টি হবে তা ভাবতেই গা শিউরে ওঠে। তবে আশার কথা হলো আমাদের কৃষি সমৃদ্ধ। আমাদের সেই সক্ষমতা রয়েছে। সমৃদ্ধ কৃষির ওপর ভর করে এ যাত্রায় বেঁচে যাব আমরা। তবে আমাদের কৃষি বিপণনে যথেষ্ট সমস্যা রয়েছে। প্রায়ই পত্রিকায় দেখা যাচ্ছে কৃষকেরা কৃষি পণ্যের মূল্য পাচ্ছে না। ফলে হতাশ হয়ে পড়েছে অনেক সবজি চাষি। আমাদের বাজার ব্যবস্থাপনার ওপর কড়া চোখ রাখতে হবে।
আমাদের মূল খাদ্যশস্য হলো ধান। এই ধান উত্পাদনে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ। হাওরে বোরো মৌসুমের ধান কাটা শুরু হয়েছে। হাওরের ধান সঠিকভাবে ঘরে তুলতে পারলে আগামী কয়েক মাস আমরা নিশ্চিতে চলতে পারব। আমাদের কোনো দেশের ওপর নির্ভর করতে হবে না। সরকার ইতিমধ্যে কৃষিতে ৪ শতাংশ সুদে ৫ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা ঘোষণা দিয়েছে যা সময়োপযোগী। তবে সুদের হার কমানো উচিত। সারের জন্য ৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি, বীজের জন্য ১৫০ কোটি টাকা প্রণোদনা ঘোষণা করেছে যা বাস্তবসম্মত। এখন গ্রীষ্মকালের সবজি চাষে গুরুত্ব দিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তারা কৃষকের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন প্রণোদনার বীজ। তারা ঝুঁকি নিয়ে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন। স্বয়ং কৃষিমন্ত্রী হাওরের ধানের অবস্থা পরিদর্শনে মাঠে চলে গেছেন। এতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাসহ কৃষকরা অনুপ্রাণিত হবে। ইতিমধ্যে সরকার তড়িত্ গতিতে হাওরের ধান কর্তনে কম্ব্বাইন্ড হারভেস্টার বরাদ্দ দিয়েছে, উত্তরবঙ্গ থেকে বিশেষ বাসে হাওর অঞ্চলে প্রথম দফায় পৌঁছে গেছে ৫ হাজার শ্রমিক, ধান কাটতে ছাত্ররা স্বেচ্ছাশ্রমে মাঠে নেমে পড়েছে। এ পর্যন্ত সবই আশাব্যঞ্জক।
বিশ্বের ১২১ দেশে বাংলাদেশের কৃষিপণ্য রপ্তানি হয়। যেহেতু করোনার প্রভাবে বৈশ্বিক খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে। সেক্ষেত্রে দেশীয় চাহিদা পূরণ করে বাংলাদেশ বিশ্বে নেতৃত্ব দিতে পারবে। শাকসবজি রপ্তানি করে বছরে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পরিমাণ ৬০০ কোটি টাকা পেরিয়ে গেছে। বিশ্বের প্রায় ৫০টি দেশে বাংলাদেশের সবজি যাচ্ছে। ৫০ রকমের সবজি রপ্তানি হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যে, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জার্মানি, ডেনমার্ক, সুইডেন, জাপান, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ওমান প্রভৃতি দেশে সবজি রপ্তানি হচ্ছে। এসব দেশে বাংলাদেশের শাকসবজি বেশ জনপ্রিয়। চা, তামাক রপ্তানিতে আয় আশাব্যঞ্জক রয়েছে। ইপিবির তথ্যানুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যে ৯০ কোটি ৮৯ লাখ ডলারের রপ্তানি আয় হয়েছে।
বৈশ্বিক খাদ্যসংকট দেখা দিলে বাংলাদেশ হতে ফল রপ্তানিতে বিরাট সুযোগ থাকবে। মানবিক দেশ হিসেবেও বাংলাদেশ বিশ্বের অনেক দেশের পাশে দাঁড়াতে পারবে। কৃষক ও কৃষিবিদদের ওপর এখন চ্যালেঞ্জ। তাদের হাতেই সচল হবে অবরুদ্ধ অর্থনীতির চাকা। করোনার মাঝে বিশ্বে খাদ্যঘাটতি হবে বলে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন। আশা করা যায় সমৃদ্ধ কৃষির হাত ধরে বাংলাদেশ এ লড়াই ভালোভাবে লড়বে এবং জিতবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
