করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় পীরগঞ্জে সরকারি ত্রাণের (জিআর) চাল বিতরণে তেলেসমাতি ঘটনা ঘটেছে। ৫১ মেট্রিক টন চাল এবং ৯ লাখ ২০ হাজার টাকার হদিস মিলছে না। উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যানরা ক্ষুব্ধ হয়ে ত্রাণের চাল হরিলুট হওয়ার অভিযোগ করেছেন।
প্রতিদিন ত্রাণের জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিদের বাড়ি বাড়ি ছুটছে নিম্ন আয়ের অসহায় মানুষ। উপজেলায় ত্রাণ হিসেবে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত ২৫১ মেট্রিক টন চাল এবং ওই পরিমাণ নগদ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে জেলা প্রশাসন।
উপজেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (পিআইও) মিজানুর রহমান জানান, কয়েক দফায় ত্রাণের ২৫১ মেট্রিক টন চাল এবং ৯ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ আসে। প্রতিটি বরাদ্দই ইউনিয়নে বিভাজন করে ইউপি চেয়ারম্যানদের নামে ডিও দেওয়া হয়। হিসাব মতে, ১৫টি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় ২০০ মেট্রিক টন চাল বিতরণে ডিও দেওয়া হলেও অবশিষ্ট ৫১ টন পৌর ও ইউনিয়নে বিতরণে ডিও দেওয়া হয়নি। এ প্রসঙ্গে পিআইও জানান, অবশিষ্ট ৫১ মেট্রিক টন চাল ও নগদ টাকা ইউএনও টি এম এ মমিন, উপজেলা চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মণ্ডল, ভাইস চেয়ারম্যান শফিউর রহমান মণ্ডল নিজ উদ্যোগে বিতরণ করেন।
পিআইও ১৯৬ টন চাল বিতরণ দেখালেও উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আবদুর রশিদ জানান, গতকাল বুধবার পর্যন্ত উপজেলার দুটি খাদ্যগুদাম থেকে ৯০ টন চাল সরবরাহ দেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যানুযায়ী ৫১ টন চাল এবং ৯ লাখ ২০ হাজার টাকার কোনো হদিস মিলছে না।
এদিকে পিআইওর তথ্যমতে ৫১ মেট্রিকটন চাল ও টাকা ইউএনও, উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান বিতরণ করলেও কাগজেকলমে ৭, ৯, ১৩ নম্বর ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদের নামে ১০ মেট্রিক টন করে ডিও দেখানো হয়েছে।
পীরগঞ্জ সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম ময়না জানান, ডিওতে আমি স্বাক্ষর করিনি। আমার ইউনিয়নে বরাদ্দ কেন ওই তিন জন বিতরণ করবে? বড়ো আলমপুর ইউপির চেয়ারম্যান হাফিজার রহমান বলেন, আমার নামে বরাদ্দকৃত ১০ মেট্রিক টন চাল ইউএনও স্যার নিয়েছেন। তিনি কোথায় দিয়েছেন, তা আমি জানি না। তবে বিষয়টি মৌখিকভাবে জানালেও এখনো ডিওতে স্বাক্ষর করিনি। একই মন্তব্য ১৩ নম্বর রামনাথপুর ইউনিয়নের চেয়্যারম্যান ছাদেকুল ইসলাম বিএসসির।
এ প্রসঙ্গে রায়পুর ইউপির চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান দুলাল চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকারি ত্রাণ হরিলুট করা হচ্ছে। আর আমরা দরিদ্র মানুষের অত্যাচারে বাড়িতে থাকতে পারছি না। সদর ইউপির চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম ময়না মাস্টারের নামে ১০ মে. টন চালের ডিও ইস্যু হলেও তিনি ওই চাল উত্তোলনে অপরাগতা প্রকাশ করেন। ফলে ৩ চেয়ারম্যানের নামে ৩০ টন চালের ডিও নিয়ে এক নাজুক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অপরদিকে ত্রাণ হিসেবে ৯ লাখ ২০ হাজার টাকা কোথায় কীভাবে ব্যয় করা হয়েছে, তার কোনো হদিসই মিলছে না।
এ ব্যাপারে মিঠিপুর ইউপি চেয়ারম্যান এসএম ফারুক, শানেরহাট ইউপি চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান, চতরা ইউপি চেয়ারম্যান এনামুল হক শাহীন, কাবিলপুর ইউপি চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম রবি, ভেন্ডাবাড়ি ইউপি চেয়ারম্যান রবিউল ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, জেলা প্রশাসকের বরাদ্দ সঠিকভাবে বিভাজন করলে ত্রাণের চাহিদা কমতো। মাঠ পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের মতামত ছাড়াই ওই তিন ব্যক্তি ৫১ টন চাল কীভাবে বিতরণ করে বুঝি না। এছাড়া পিআইও কে নগদ টাকার কথা জিজ্ঞেস করলেও তিনি সদুত্তর দিতে পারেননি। টাকা পেলে হয়তো আরো অনেক নিরীহ মানুষকে সহায়তা দেওয়া যেত।
পিআইও বলেন, তিন ইউপি চেয়ারম্যানের নামে ৩০ টন চাল ডিও করে উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা পরিষদের মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা টিএমএ মমিন জানান, আপত্কালীন হিসেবে বিধিসম্মতভাবে ওই চাল উপজেলা প্রশাসন ও পরিষদ নিজ উদ্যোগে বিতরণ করেছে।
উপজেলা চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মণ্ডলের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলেও ফোন রিসিভ করেননি। এ প্রসঙ্গে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পৌর মেয়র জানান, বিষয়টি খতিয়ে দেখছি আমরা।
উল্লেখ্য জিআর ও নগদ অর্থ বিতরনের বিষয়টি সাংবাদিকদেরকে অবহিত করার সরকারি নির্দেশনা থাকলেও উপজেলায় তা উপেক্ষিত হয়েছে রহস্যজনক কারণে।
