ভারতীয় নাট্যশাস্ত্র অনুযায়ী নায়িকার অনেক প্রকারভেদ। তবে নায়িকা বলতে একটি কাহিনির প্রধান চরিত্রকেই বোঝায়। আমার জীবনের প্রথম নায়িকা হচ্ছেন আমার মা। কী উজ্জ্বল সোনার বরণ গায়ের রং, ঘনকৃষ্ণ মেঘের মতো চুলের রাশি, চাঁপার মতো হাতের আঙুল, মিষ্টি মধুর কণ্ঠস্বর, আর হাসি তো নয়, নয়ন মনোহর এক প্রাণ জুড়ানো হাসি। আমার সেই অষ্টাদশী নায়িকা মায়ের কোলে বসে যে নায়িকাকে দেখেছিলাম তার কথা আজ লেশ মাত্র মনে না থাকলেও পরবর্তী জীবনে শুধু সেদিনের সে নায়িকার স্নেহধন্য হওয়াই নয়, তার সঙ্গে এক টেবিলে বসে আমার মুখে সেদিনের সে গল্প শুনে প্রৌঢ়া সেই নায়িকার সে কী হাসি। পিতার কর্মসূত্রে আমার তখন আমাদের ঘরের কাছে আরশিনগর চাটগাঁয় সিনেমা হলে বসে ছবি দেখতে গিয়ে নায়ককে কলা খেতে গিয়ে কলা খাওয়ার বায়না ধরে হঠাত্ কেঁদে উঠে যে দৃশ্যের অবতারণা করেছিলাম তাতে আর কার কী হয়েছিল বলতে পারব না তবে আমার অষ্টাদশী মা যে সন্তানকে বুকে জড়িয়ে কী বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছিলেন আজ এত বছরের ব্যবধানে সে কথা মনে করে মরমে মরে যাই। ছবিটির নামধাম বলতে পারব না তবে শুনেছি নায়ক-নায়িকার ভূমিকায় ছিলেন একক ও অনন্য ফয়সল ও কাননবালা। ১৯৭১ সালে আমাদের গৌরবমণ্ডিত মুক্তিযুদ্ধের সময় হঠাত্ একদিন পাকিস্তানি নরপিশাচদের হাত থেকে বাংলাদেশকে বাঁচাতে সম্ভবত নভেম্বরের দিকে স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির দাবিতে কলকাতায় নাগরিকসমাজের পক্ষ থেকে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে এক সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল। সেদিন বেলা এগারোটা থেকে যে সমাবেশ জমতে শুরু করেছিল সেটা যে বেলা তিনটার মধ্যে স্মরণাতীত কালের মধ্যে এত বৃহত্ সমাবেশের আকার ধারণ করবে, সুদূর কল্পনাবিলাসীদের কাছেও তা ছিল ধারণাতীত। কে আসেননি সেদিন! সিনেমার এবং মঞ্চের অভিনেতা অভিনেত্রী পরিচালক কলাকুশলী থেকে শুরু করে কবি শিল্পী সাহিত্যিক শিক্ষাবিদ এবং ব্রতী পেশাজীবী সবাই মিলে সত্যিকারের জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল। তবে জনগণ যে কত ভয়ংকর রূপ ধারণ করতে পারে সেদিনকার সে সমাবেশ যিনি বা যাঁরা উপস্থিত ছিলেন না তাদের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। সেখানেই একটা সময় যখন দেখলাম বয়সের ভারে পৃথুলা কাননদেবী অচিন্তনীয় ভিড়ে ঠেলাঠেলিতে পড়ে গিয়ে পদদলিত হচ্ছেন তখন সেই মুহূর্তে কোত্থেকে যেন ঈশ্বর প্রেরিত দূতের মতো অঙ্গনে উদয় হলেন খ্যাতনামা চলচ্চিত্রকার অজয় কর। অজয়দার সঙ্গে মুহূর্তমাত্র চাওয়া-চাওয়ি হতেই বললেন ‘কী দেখছিস যেভাবেই পারিস ঝাঁপিয়ে পড়, প্রাণে বাঁচা।’ যেভাবেই হোক এই মহিলাকে বাঁচাতেই হবে। তারপরের আধ ঘণ্টাখানেকের মতো অগ্নিপরীক্ষার ভেতর দিয়ে যেতে গিয়ে যে নিগ্রহ সহ্য করতে হয়েছিল তার থেকে যে কীভাবে নিষ্কৃতি পেয়েছিলাম সে কথা আর না বলাই সঙ্গত। শুধু মনে আছে কাননদেবীকে প্রায় চ্যাংদোলা করে একটু দূরে ট্রামলাইন ছাড়িয়ে দাঁড়ানো অজয়দার গাড়িতে পুরে দিতে পেরে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিলাম। এই প্রসঙ্গে আর দুটি ঘটনার কথা না বললেই নয়। বাজারে জোর গুজব ছিল উত্তমকুমার আসবেন বা আসতে পারেন। আর যায় কোথায়। এসেছিলেনও। অবস্থা দেখে ত্বরিত গতিতে গাড়ি ঘুরিয়ে পগার পার। কিন্তু জনতা আর অধিকাংশই উচ্চবিত্ত নিম্নবিত্ত শ্রেণির, ছিলেন গৃহবধূরা, সমুদ্র ঢেউ হয়ে উত্তাল তরঙ্গের মতো দুলেছিলেন এপাশ-ওপাশ, এদিক-ওদিক, ডাইনে-বাঁয়ে। আর অপর্ণা, মাধবীরা ‘যঃ পলায়েতে স জীবতে’ করে কানের কাছ দিয়ে পার পেয়ে গিয়েছিল। এ তো গেল একটা উপাখ্যান মাত্র।
....
‘রোমান হলিডে’ ছবিটি দেখেছিলাম চৌদ্দবার, যার নায়িকা অড্রে হেপবার্নের সঙ্গে এই ঢাকায় হাত মেলানোর সুযোগে যখন বলছিলাম এমন একটুকরো মধুর অনাবিল হাসি উপহার দিয়েছিল যার দাম হীরে জহরত্ দিয়েও হয় না। তারপর সুইডিশ চলচ্চিত্রকার ঈঁঙ্গমার বার্গম্যানের ছবির ব্যক্তিত্বশালিনী নায়িকা লিভ উলম্যানের সঙ্গেও এক বর্ষণপ্লাবিত দুপুরে ঢাকার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় দেখা হয়। তাঁর লেখা আত্মজীবনী বইটি আমার হাতে দেখে সবিস্ময়ে শুধিয়েছিলেন ‘কেমন লেগেছে?’ ব্যস তাতেই ধন্য জ্ঞান করেছি। (অংশবিশেষ)
লেখকের ‘জীবনের আশ্চর্য ফাল্গুন’ (গদ্যপদ্য, ২০১২) বই থেকে
