এই মুহূর্তে বিশ্বের ৩ শতাংশ জিডিপি খাইয়া ফালাইয়াছে করোনা ভাইরাস। ইহা বিশ্ব অর্থনীতির আরো কতখানি ক্ষতিসাধন করিবে তাহা এখনো কেহ বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছে না। রহস্যময় করোনা ভাইরাসকে দমাইতে না পারিলে বিশ্বের অর্থনীতির পাশাপাশি বেশির ভাগ মানুষের জীবন-জীবিকার উপর নামিয়া আসিবে চরম অভিঘাত। সেই অভিঘাত হইতে রক্ষা পাইতে সারা বিশ্ব তাকাইয়া রহিয়াছে একটি কার্যকর ভ্যাকসিনের দিকে। বলা যায়, সারা বিশ্ব ঝাঁপাইয়া পড়িয়াছে করোনার টিকা আবিষ্কারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও স্পষ্ট করিয়াই বলিয়া দিয়াছে, প্রতিষেধক ছাড়া করোনা হইতে মুক্তির পথ নাই। ইতিমধ্যে জানা গিয়াছে, আমেরিকায় একটি এবং চীনের দুইটি সংস্থা নাকি প্রতিষেধকের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অনেকটাই আগাইয়া গিয়াছে। আর ইহার মধ্যেই ব্রিটেন জানাইয়াছে যে, আগামী সেপ্টেম্বরেই নাকি করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন বাজারে আনা সম্ভব হইবে! গতকাল বৃহস্পতিবার হইতে শুরু হইতেছে মানুষের উপরে সেই সম্ভাব্য প্রতিষেধকের পরীক্ষা। জার্মানিতেও এই ধরনের পরীক্ষায় সরকারি ছাড়পত্র মিলিয়াছে। প্রথম পর্যায়ে জার্মানিতে ১৮ হইতে ৫৫ বত্সর বয়সি ২০০ স্বাস্থ্যবান ব্যক্তির উপর এই ভ্যাকসিন পরীক্ষা করিয়া দেখা হইবে। দ্বিতীয় পর্যায়ে করোনা আক্রান্তসহ আরো অনেক ব্যক্তির উপর পরীক্ষা হইবে। অন্যদিকে ব্রিটেনে পরীক্ষা হইবে ৫০০ জনের উপর। এই প্রতিষেধকের সাফল্য লইয়া অক্সফোর্ডের গবেষকেরা ৮০ ভাগ নিশ্চিত।
কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলিতেছেন করোনার কার্যকর টিকা আবিষ্কার এত সহজ নহে। প্রথম সমস্যা হইল, প্রতি মুহূর্তে রূপ বদলাইতেছে করোনা ভাইরাস। ফলে ভ্যাকসিন তৈরি কারাটা সময়ের ব্যবধানে বড়ো চ্যালেঞ্জ হইয়া দেখা দিতেছে। এমনিতেই বিশ্বব্যাপী নানান রোগের ভ্যাকসিনের অনেক বড়ো একটি বাজার রহিয়াছে। বৈশ্বিক ভ্যাকসিন-শিল্পে বড়ো কোম্পানিগুলি গত বত্সর বিশ্বব্যাপী টিকা বিক্রয় করিয়াছিল ৫ হাজার ৪০০ কোটি ডলার, যাহা ২০১৪ সালের দ্বিগুণ। আর এই বৃদ্ধির মূল কারণ হইল ইনফ্লুয়েঞ্জা, সোয়াইন ফ্লু, হেপাটাইটিস ও ইবোলার মতো রোগগুলি। করোনা গোত্রের অন্য ভাইরাস, যাহা সার্স ও মার্সের জন্য দায়ী, সেই টিকা ঐ রোগের প্রাদুর্ভাবের সময় বাজারে আনা সম্ভব হয় নাই এবং সার্সের জন্য এখনো কোনো টিকা নাই। অন্যদিকে ইবোলার ক্ষেত্রে প্রথম টিকা বাজারে আসে ২০১৫ সালে, পশ্চিম আফ্রিকায় তাহা সফলও হইয়াছিল।
মনে রাখিতে হইবে, ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হইলেও রেগুলেটরির অনুমোদন পাইতে বহু ক্ষেত্রে কয়েক বত্সর সময় লাগিয়া যায়, কারণ বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হইতে চাহেন যে ইহার কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নাই। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় সোয়াইন ফ্লুর ভ্যাকসিনের কথা। ২০০৯-১০ সালে প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষকে ইহার ভ্যাকসিন দেওয়া হয়; কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, ভ্যাকসিনটি নেওয়ার পর বারবার ঘুম পাইত, অর্থাত্ স্লিপিং ডিজঅর্ডার সমস্যা দেখা দিত। সুতরাং স্পষ্ট করিয়াই বলা যায়, ভ্যাকসিন আবিষ্কার হইলেও এবং আপাতত সফল ট্রায়াল হইলেও উহার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সম্পূর্ণ ফলাফলের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করিতেই হইবে। আশার কথা একটাই, সারা বিশ্বের এত ব্যাপক প্রচেষ্টার সুফল আসিবে নিশ্চয়ই।
