আরশিনগর

যুদ্ধ নয়, করোনার বিরুদ্ধে লড়ছে কল্যাণমুখী ভারত

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২০, ০০:২৯

ঘুম ভাঙল সকাল ৯টায়। দুই চোখে আটকে রইল অনিদ্রার ঘোর। কিছুক্ষণ। অনেকক্ষণ। চিত হয়ে পড়ে থাকল দেহ। নিস্তেজ। নিঃসঙ্গ। সময় বাড়ছে। স্তব্ধ আবাসনে গর্জে উঠল তীর্যক, অতর্কিত কোলাহল—লকডাউনে হকার কেন ঢুকছে? কেন ঢুকছেন গৃহকর্মীরা? মুহূর্তে ঘুম ঘুম ভান শেষ। বিরক্ত। কণ্ঠহীন স্বরহীন অস্বস্তি ছড়ি ঘোরাচ্ছে। মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে ‘ধুত্ ছাই’ আওয়াজ তুলে, বালিশের পাশে সাজিয়ে রাখা সংবাদপত্রের শীর্ষ খবরে পরপর, দ্রুত আরো দ্রুত চোখ ছড়িয়ে অনুভব করলাম ক্লান্তি নেই। ঘরের আধা-অন্ধকারে ঢুকছে গুচ্ছ গুচ্ছ স্বস্তি। বাহ, বলে উঠে পড়লাম। জেগে উঠলাম। টের পাচ্ছি দাঁড়িয়ে উঠছে ভারত। আমার দেশ। আমার মাতৃভূমি। কল্যাণমুখী গণতন্ত্রের বৃহত্তম, লড়াকু ভূখণ্ড। কেন এই ভাষায় জয়কীর্তন করতে হচ্ছে? এ কি কোনো সামাজিক আত্মতৃপ্তি বা দেশ গৌরবের অতিরিক্ত ঢাক-ঢোল? না। একদম নয়। এরকম বলা বা ভাবনার কারণ—লকডাউন পর্বে করোনা আক্রান্ত ভারতে সংক্রমণের হার কমছে। সুস্থ হয়ে রোগীদের বাড়ি ফেরার সংখ্যা বাড়ছে। নতুন নতুন অসুস্থেরও সংখ্যা ঊর্ধ্বগতিকে হারিয়ে দিচ্ছে। চিকিত্সা ও পরিষেবার মরণপণ লড়াইয়ের আয়তন সমাজকে হরদম উত্সাহ জোগাচ্ছে। সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্পণ্যহীন ঐকান্তিকতা তাদের দায়বদ্ধতাকে উঁচু করছে। দেহকে স্বগৃহে আটকে রেখে চিত্ত তার বিত্তকে রোগীর সেবায় বিলিয়ে দিচ্ছেন শিল্পদ্যোগীরা। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো অস্তিত্বকে অধিকতর মান্যতা দিয়ে রিজার্ভ ব্যাংক প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের জন্য ঋণ গ্রহণের সময়সীমা বাড়িয়ে দিল। ২০১৯-২০ সালের ব্যাংকগুলোকে মুনাফার অংশ দিতে হবে না। ঘরবন্দির জেরে যেসব কৃষক বিধ্বস্ত দিশেহারা, যেসব ছোটো শিল্পে সংস্থা এবং আবাসন, তাদের অকাতরে ঋণ জোগানো হবে। রিজার্ভ ব্যাংক এনবিএফসি আর ক্ষুদ্র ঋণের সংস্থাকে ৫০ হাজার কোটি জোগান দেবে, অর্থ দেবে নাবার্ডকে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন—ছোটো-মাঝারি শিল্প, গরিব কৃষক, গরিব ব্যবসায়ীদের পাশে দাঁড়াতেই এসব উদ্যোগ।

এরই মধ্যে, আশাপ্রদ আরেকটি খবর—ঘোর সংকটেও থেমে থাকছে না ভারতের বৃদ্ধি ও প্রবৃদ্ধি। জি-২০ দেশগুলোর মধ্যে উন্নয়নের প্রায় শীর্ষে থাকবে দেশ। বাড়বে তার অভ্যন্তরীণ উত্পাদন ও বহির্মুখী বাণিজ্য। এটা কি কেবল আগাম ঘোষণা? না তার বাস্তব লক্ষণও ফুটে উঠেছে?

এই যে করোনা আক্রান্ত বহু দেশে ওষুধ পাঠাচ্ছে ভারত; এই যে মহাবলী আমেরিকাকেও হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন দিয়েছে। ওষুধ দিচ্ছে স্পেন, ব্রিটেন, আফ্রিকা এবং পশ্চিম ও পূর্ব এশিয়ার বহু দেশকে, এতে ভারতের কল্যাণময়তার মুখ আর অভিমুখ কি প্রশস্ত হচ্ছে না? উঁচু হয়ে উঠছে না তার জগেসবার ভাবমূর্তি?

১৯৪৭-এ, জন্মলগ্নেই দিল্লির ঘোষিত অঙ্গীকার এখানে, এই মুহূর্তে স্মরণ করা জরুরি। যে কোনো দুর্যোগে বিপন্নের পাশে থাকা, বিশ্বকে সহূদ প্রতিবেশীর মতো বুকে জড়িয়ে ধরাই তার অভিপ্রায়। যুদ্ধ নয়, রক্তক্ষয় নয়, গন্তব্য তার শান্তি। ৭০ বছরের ইতিহাসে এমন একটি দৃষ্টান্ত নেই, যা দেখিয়ে ভারতকে আগ্রাসী, যুদ্ধবাজ বলা যাবে। কৌশলগত কারণে বিনাযুদ্ধে সিকিমকে মানচিত্রের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে বটে; কিন্তু এই সংযুক্তিতে সায় ছিল সিকিমবাসীর। সমর্থন ছিল আবিশ্ব জনমতের। বিতর্কিত, মহান জননায়ক শেখ আবদুল্লাহর নেতৃত্বাধীন অবিভক্ত কাশ্মীরে, অভ্যন্তরীণ নানা উসকানি সত্ত্বেও, দেশভাগের মুহূর্তে আগ বাড়িয়ে নেহেরু সেনা পাঠান নি। যখন উপজাতীয় লেঠেল বাহিনীকে সীমান্তের ওপার থেকে আগ্নেয়াস্ত্রসহ পাকিস্তান ঠেলে ঠেলে পাঠাল; যখন কাশ্মীরি মহিলাদের ইজ্জত লুট শুরু হয়ে গেল, যখন গোপনে হরিপর্বতের নিরাপদ প্রাসাদ ছেড়ে পালালেন রাজা হরি সিং; যখন স্বেচ্ছাসেবীদের সঙ্গে নিয়ে অস্ত্রহীন, সম্বলহীন শেখ আবদুল্লাহ বহিরাগতের হামলা রুখছেন প্রবল দুঃসাহসে, কিছু কুচক্রী দাঙ্গা বাধিয়ে দিল জম্মু এলাকায়, তখনই দিল্লি থেকে ভেসে এল মহাত্মা গান্ধীর অসহায় অভয়বার্তা, মাই হার্ট লাইজ উইথ শেখ আবদুল্লাহ। যুদ্ধবিরোধী নেহেরু দিশেহারা। বিবেকের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সেনা পাঠালেন কাশ্মীরে। রক্তাক্ত উপত্যকার সাময়িক নিষ্কৃতি মিলল; কিন্তু তাত্ক্ষণিক বাধ্যবাধকতার নাগপাশে ঝুলে রইল, এখনো ঝুলছে কাশ্মীরীদের ভাগ্য।

সিকিম থেকে কাশ্মীর, কোথাও ভারত তার অস্ত্রজোর দেখায় নি। ঠিক একইভাবে দেশের কিংবা দূরনিকট প্রতিবেশীর দুর্যোগে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকে নি। তার পঞ্চশীল নীতিধর্মের তালিকায় স্বদেশ-বিদেশ দুই-ই সমান। মানবসেবা, দেশসেবা একে অন্যের পরিপূরক। একারণেই আজ নিজে করোনার বিরুদ্ধে যেমন লড়ছে, তেমনি বিপন্ন বিশ্বের ২১৩ দেশের লাখ লাখ মানবসন্তানের দিকে তাকাচ্ছে। দৃষ্টি তার সজল। বিষণ্ন। সংকল্পবদ্ধ। এখানে, এই আপত্কালে ভারতই ভারতের তুলনা। যার চিরঞ্জীব কণ্ঠশিল্পী বলতে পারেন, মানুষ মানুষের জন্য (ভূপেন হাজারিকার গান)। যার মনীষা (অমর্ত্য সেন) দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারেন, করোনার বিরোধিতা কোনো যুদ্ধ নয়, লড়াই কেবল লড়াই। ভাইরাসের বিরুদ্ধে। আরোপিত নৃশংসতার বিরুদ্ধে, লকডাউনজনিত অবসাদ ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে। মনুষ্যত্বের বিস্তারে আর যুদ্ধের মোকাবিলার এসব অশ্রুসিক্ত, দৃপ্ত উচ্চারণ আজ জোরে, আরো জোরে বাজছে।

n লেখক : ভারতীয় সাংবাদিক, সম্পাদক, আরম্ভ পত্রিকা