আত্মরক্ষার অধিকার সবার সমান

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২০, ০০:৩১

করোনা রোগীদের ৮৫ শতাংশই ঢাকা বিভাগের। তাই ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর জেলায় কাউফিউ চান বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, ‘দীর্ঘ সময়ের দুর্ভোগের চেয়ে স্বল্পসময়ের কষ্ট সহনশীল। তাই এখনো সময় আছে। করোনা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে করোনার খনি হিসেবে চিহ্নিত ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।’ অন্যদিকে পোশাকশিল্প মালিকদের ক্রমাগত দাবি জানানোর পরিপ্রেক্ষিতে কারখানা খুলে দেওয়ার জন্য গত ২২ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কারখানা খোলা ইস্যুতে কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়।

এ দুটো বিষয় দেশবাসীর সামনে পরস্পরবিরোধী হিসেবে সামনে আসছে। কারণ, যে এলাকাগুলোতে লকডাউন কার্যকর না হওয়ায় কাউফিউ চাওয়া হচ্ছে, সেই এলাকাগুলো মূলত শ্রমঘন এলাকা। ফলে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গভীরভাবে পর্যালোচনা করা দরকার, পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠনগুলো পোশাক খাতের ব্যবসা অন্যান্য দেশে হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা এবং শ্রমিকদের প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য কারখানা চালু করতে চাইছে তার বাস্তবায়নে আপাত সুবিধা-অসুবিধা। এর আগে মালিকরা গত ৫ এপ্রিল করোনাকালীন জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি ন্যূনতম বিবেচনায় না নিয়ে পোশাক শ্রমিকদেরকে চাকরিচ্যুতির ভয় দেখিয়ে কারখানা খোলার হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়ায় গণপরিবহন বন্ধ থাকার পরও শ্রমিকরা বিভিন্ন জেলা থেকে হেঁটে কারখানা অভিমুখে রওনা হওয়ায় দেশে করোনার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় তাত্ক্ষণিকভাবে কারখানা বন্ধ ঘোষণা করলেও করোনায় আতঙ্কিত জনগণের ব্যাপক সমালোচনা ও বিক্ষোভের মুখে গত ৬ এপ্রিল পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন সরকারি ছুটির সঙ্গে সমন্বয় করে পোশাক কারখানা বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয়। কিন্তু এর পরও এসব এলাকায় জরুরি রপ্তানিসহ পিপিই ও মাস্ক বানানোর কথা বলে দৈনিক শতাধিক কারখানা খোলা থাকার কথা জানা যায়। গত ২০ এপ্রিল গাজীপুর পুলিশ সুপারের বক্তব্য হতে পরিষ্কার হয়েছে পিপিই বানানোর নাম করে মালিকরা অন্য পণ্য বানাচ্ছেন। সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠছে, যেসব কারণ দেখিয়ে মালিকরা কারখানা খোলার দাবিতে অনড়, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও অর্থনীতির উন্নয়নের সম্ভাবনা কতটা? সেই সঙ্গে কারখানা খুলে দিয়ে যে শ্রমিকের প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার কথা বলা হচ্ছে তাদের মালিকরা কারখানা লে-অফের মধ্যে ঠেলে দিয়েছিলেন। এই ভয়াবহ করোনা মহামারিতেও বকেয়া বেতনের দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ সড়ক অবরোধ পর্যন্ত গড়িয়েছে।

যে মানুষ শ্রমিক, তার জীবনও বাংলাদেশের সংবিধানের সর্বোচ্চ পদাধিকারীর মতোই সমান মূল্যবান। শ্রমিকের প্রাণ বিপর্যয় গোটা দেশের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে ফেলতে পারে, যার প্রমাণ শ্রমঘন এলাকা হতে সারা দেশে করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। দেশের বাইরে থেকে ফিরে আসা রেমিট্যান্স উপার্জনকারী প্রবাসী শ্রমজীবীদের মাধ্যমেও কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। ফলে কৃষি, শিল্পসহ দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাত বিপর্যস্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কায় পড়েছে।

পেশাজীবী চিকিত্সকদের কেন্দ্রীয় সংগঠন বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) হিসাব অনুযায়ী, গত ২২ এপ্রিল  বিকাল পর্যন্ত চিকিত্সকসহ মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৪৩০। মিটফোর্ড, রাজশাহী মেডিক্যাল ও বারডেম আইসিইউ করোনা সংক্রমিত রোগী দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। একইভাবে চিকিত্সক দ্বারাও বাড়ছে রোগী সংক্রমিত হওয়ার ভয়। দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার বড়ো স্তম্ভ ঢাকা মেডিক্যালও এখন ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ। করিমগঞ্জ, ফটিকছড়ির মতো একের পর এক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স লকডাউনের ফলে বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে দেশের স্বাস্থ্যসেবা।

বাংলাদেশের আইইডিসিআরের নমুনা পরীক্ষার সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা বিষয়টি ইতিমধ্যেই ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছে। সার্বিক এই পরিস্থিতি আমাদেরকে কমিউনিটি ও হাসপাতাল ট্রান্সমিশনের মাধ্যমে দেশে মহামারি ছড়িয়ে পড়ার ভয়াবহ পরিণামের ইঙ্গিত দিচ্ছে। করোনার বিরুদ্ধে কেরালা বা ভিয়েতনামের মতো একদম শুরু হতেই আগ্রাসি তত্পরতা আমরা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছি।

সুসমন্বয়ের অভাবে আমাদের সরকারি উদ্যোগে নেওয়া ১০ টাকা কেজি চালের ত্রাণ তত্পরতা, এন-৯৫ মাস্ক নিয়ে জালিয়াতির মতো ভয়ংকর ঘটনা ঘটেছে, যা দরিদ্রদের অন্নসংস্থানকে অনিশ্চিত করে তুলেছে আর দেশের চিকিত্সক-নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীর জীবনকে হুমকিগ্রস্ত করে সার্বিক স্বাস্থ্যসেবাকে ফেলেছে ভয়ানক ঝুঁকিতে। অবিলম্বে এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িত সব দুর্নীতিবাজের প্রত্যেককে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান করলে আমরা এখনো সম্পদের সুষম ও ন্যায্য বণ্টনের মাধ্যমে জনস্বার্থে নেওয়া সরকারি উদ্যোগগুলোকে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজে লাগাতে সক্ষম হব। সেই সঙ্গে আমাদের জনগণের সার্বিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার কথা মাথায় রেখে পোশাক খাত, কৃষি ও শিল্পের প্রাণ শ্রমিকশ্রেণির সঙ্গে দেশবাসীর সুস্বাস্থ্যের নিশ্চয়তা সমন্বয় করে দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঠেকাতে পারব।

n লেখক : আইনজীবী, হাইকোর্ট বিভাগ,

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট