২০১৯ এর ডিসেম্বরে চীনের উহান শহরে প্রাদুর্ভাব ঘটে করোনা ভাইরাসের। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ভাইরাসটিকে পরে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোভিড-১৯ নামকরণ করে। ধারণা করা হয়, উহানের সামুদ্রিক খাবারের বাজার থেকে এই ভাইরাসের উৎপত্তি। এখন পর্যন্ত ১৮৪টি দেশ প্রায় ২৬ লক্ষ মানুষ করোনা ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হয়েছে । এই ভাইরাসে ১ লাখ ৮৬ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছেন। করোনায় একদিকে যেমন লকডাউনে ঘরবন্দি হয়ে পড়েছে মানুষ ঠিক তেমনি এর প্রভাবে পড়েছে পরিবেশের ওপরেও। পরিবেশের ওপর করোনার প্রভাব এবং ধারাবাহিক ৪ পর্বের প্রথম পর্ব আজ।
করোনা ছড়িয়ে পড়ার পর থেক চীনের অধিকাংশ কলকারখানা বন্ধ রাখা হয়েছে। করোনার প্রভাবে জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে। গত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পূর্বঘোষিত বহু অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। যেমন জেনেভার মোটর শো এবং হিউস্টনে বার্ষিক তেল ও গ্যাস নির্বাহীদের কেরাউইক সম্মেলন বাতিল করা হয়েছে। বন্ধ করা হয়েছে শাংহাইয়ের ফর্মুলা ওয়ান কার রেসিং।
যুক্তরাজ্য ভিত্তিক জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক ওয়েবসাইট কার্বন ব্রিফের এক প্রতিবেদন বলছে, সম্প্রতি চীনে প্রায় ২৫ শতাংশ কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন কমেছে। ২০০৮ সালে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার সময়েও বায়দূষণের হার কমে গিয়েছিল। তবে সেবারের ঘটনাটি ছিল কিছুটা ধীর প্রক্রিয়ায়। এবার দূষণ হ্রাসের হার অনেক বেশি এবং দীর্ঘস্থায়ী। দেশটিতে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণে সবচেয়ে বেশি দায়ি করা হয় পরিবহন খাতকে।
স্কুল এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলি বন্ধ হয়ে পড়ার ফলে মানুষ সরকারি নির্দেশনা মেনে ঘর-বন্দি থাকছে, ফলে দেশটির যোগাযোগ ব্যবস্থা স্তিমিত হয়ে পড়েছে। এতে করে দিন দিন কার্বন নিঃসরণ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাচ্ছে।
সম্প্রতি মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার স্যাটেলাইট ছবিতেও দেখা গেছে, করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রভাবে চীনের বায়ুদূষণ কমে গেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, চীনের অত্যাধিক ভাইরাস সংক্রমিত এলাকাগুলোয় নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ কমে গেছে আশ্চর্যজনক হারে। সংস্থা টি ২০১৯ সালের প্রথম দুই মাসের এবং চলতি বছরের প্রথম দুই মাসের বায়ুদূষণের একটি স্যাটেলাইট ছবি প্রকাশ করেছে। সেখানে চীনে বায়ুদূষণের বড় পার্থক্য দেখা গেছে।

পরিবেশগত অর্থনীতিবিদ মার্শাল বার্ক এক্সপ্রেস ডট ইউ কে কে জানান তিনি গণনা করেছেন করোনা শুরু হওয়ার পর প্রথম দু'মাস পরিবেশ দূষণ হ্রাস চীনের পাঁচ বছরের কম বয়সী ৪ হাজার বাচ্চা এবং ৭৩ হাজারের এর চেয়ে বেশি প্রাপ্তবয়স্কদের জীবন বাঁচিয়েছে। এটি করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের চেয়ে প্রায় ৭০ হাজারেরও বেশি লোকের জীবন রক্ষা করেছে।
ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক ও পরিবেশগত স্বাস্থ্যের অধ্যাপক জিম জাং বলেন, "এটি নিয়ে কোনও প্রশ্নই আসে না, যখন বায়ুর গুণগতমানের উন্নতি হবে তখন এটি স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সমস্যা হ্রাসের সাথে যুক্ত হবে"। তিনি আরো বলেন, যে ২০০৮ গ্রীষ্মের অলিম্পিকের সময় বেইজিংয়ে এটি স্পষ্ট হয়েছিল। বেইজিংয়ের বাতাস বিশুদ্ধ করার জন্য, সরকারী আদেশে গেমসের আগে এবং চলাকালীন সময় কারখানাগুলি বন্ধ করে দেয় এবং গাড়ি ভ্রমণ সীমিত করে দেয়। এতে শহরটির বায়ু দূষণের মাত্রা অর্ধেকে নেমে গিয়েছিল।
ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও এপিডেমিওলজিস্ট জিল বাউমগার্টনার এন পি আর কে বলেছেন, "এই কথা বলা ভুল যে এই বায়ু দূষণ কমে যাওয়ার কারণে করোনভাইরাস স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারী ছিল।" তিনি আরো বলেন, চীন তার অরথনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ পুণরুদ্ধার করার জন্য তার শিল্প কারখানা আবার চালু করতে যাচ্ছে যা পরিবেশকে আবার ক্ষতির সম্মুখীন করবে।
ইত্তেফাক/এআর
