বাংলায় প্রবাদ আছে, ‘চোরের সাত দিন গৃহস্থের এক দিন’। এই কথার মানে হলো চোর সাত দিন চুরি করে পার পেয়ে যেতে পারে, কিন্তু একদিন সে গৃহস্থের কাছে ধরা পড়বেই। আরো সহজ করে বললে বলা যায়, চোর সাত দিন চুরি করল অষ্টম দিন চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ল। অর্থাত্ আট দিনের মধ্যে সাত দিন ধরা না পড়লেও একদিন চোর ধরা পড়বেই। যাহোক, করোনা ভাইরাসের মহামারির ঋতুতে চোর শব্দটি আবারও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। তবে এই আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে ‘ত্রাণ চোর’ নিয়ে। এই ‘ত্রাণ চোর’দের নিয়ে আলোচনার আগে ‘চোর’ শব্দটি নিয়ে কিছু প্রাসঙ্গিক আলোচনা সেরে নেওয়া যাক। বৈদিক যুগে চোর শব্দটি গালি অর্থে ব্যবহূত হতো। তখন শব্দটি দিয়ে ‘অনার্য’, ‘অসভ্য’ বোঝাত। পরে দক্ষিণ ভারতে অর্থবিকারে চোর শব্দের অর্থ দাঁড়িয়েছে ‘তস্কর’।
চুরি যে করে সে চোর বা তস্কর । চৌর্যবৃত্তি যার পেশা সে পেশাদার চোর। সমাজের চোখে চুরি অপরাধ এবং চোর অপরাধী। চুরি মানে না বলে পরদ্রব্য নেওয়া। একে পেশাদার চোররা শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে এবং বিদ্যা হিসেবে শেখাতে পারে। কথায় বলে : ‘চুরি বিদ্যা মহাবিদ্যা যদি না পড়ে ধরা।’ ধরা পড়লে চুরি দণ্ডণীয় অপরাধ। স্থান-কাল-পাত্রবিশেষে চুরির দণ্ড ও দণ্ডদাতা বিভিন্ন হতে পারে।
বাংলা ভাষায় চোর শব্দটি বেশ গতিশীল। চোরাকাঁটা (ঘাসজাতীয় গুল্ম), চোরাকুঠুরি (ঘরের ভেতরে ছোটো গুপ্ত কক্ষ বা টাকাপয়সা রাখার গুপ্ত ঘর বা সিঁড়ির নিচের খোপ), চোরখণ্ডা (মধ্যযুগের বাংলায় চোর ও অন্যান্য দুষ্ট প্রকৃতির লোক বোঝাতে শব্দটি ব্যবহূত হতো), চোরখেলা (এক প্রকার শিশুতোষ খেলা), চোর-ছ্যাঁচড় (চোর ও প্রতারক), চোরপ্রপাত (প্রাচীনকালে যে স্থান থেকে দণ্ডিত চোরকে নিচে ফেলে হত্যা করা হতো) ইত্যাদি শব্দ বাংলা ভাষার ভান্ডার সমৃদ্ধ করেছে।
আবার চোরকে কেন্দ্র করে বাংলায় রয়েছে একাধিক প্রতিষ্ঠিত প্রবাদবাক্য। যেমন—চোর মরে সাতঘর মাজায়ে (চোর ধরা পড়লে অনেককে মামলায় জড়ায়), চোরে চোরে কুটুম্বিতা (দুষ্ট লোকদের মধ্যে পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতা ও সদ্ভাব), চোরে চোরে মাসতুতো বা খালাতো ভাই (এক পথের পথিক বা একই কাজের কাজি), চোরের ওপর বাটপাড়ি (চোরকে ঠকিয়ে উপার্জন), চোরের মায়ের কান্না (চোর ছেলের দণ্ড ভয়ে তার মায়ের গোপন কান্না বা গোপন করা অন্তর্দাহ), চোরের মা’র বড়ো গলা (অতিমাত্রায় অসত্ ব্যক্তির অতিরিক্ত সাধুতার ভান, নিজে অসত্ তা ভালোভাবে জেনেও অন্যের ওপর চোটপাট)।
চুরি আমাদের দেশে একটি প্রাচীন পেশা। এদেশে চোর ও চোর ধরা সম্পর্কে এক মহাজন বলেছেন, একসময় সিঁধেল চুরিটা ছিল বঙ্গের বৈশিষ্ট্য। ঘরের দাওয়ায় সিঁধ কেটে চোর ঘরে ঢুকত। আমাদের ছেলেবেলায় আমরা গ্রামে সেটা খুব দেখেছি। এখন বিত্তশালী বাংলায় প্রায় সব ঘরের দাওয়াই পাকা, খন্তা দিয়ে সিঁধ কাটার জো নেই। যাহোক, সেকালে সিঁধ কেটে চুরি করতে গিয়ে কোনো কোনো হতভাগা চোর ধরাও পড়ত। ঘরের লোক ঘুম থেকে জেগে উঠলে চোর সিঁধ দিয়ে বেরিয়ে যেতে চাইত। ঘরের লোক চোরের ঠ্যাং ধরতে চাইত। কখনো দেখা যেত চোরের ঠ্যাং ছেড়ে ধরে ফেলেছে তার লাঠি। চোর দ্রুত পালিয়ে যেত। কলিকালে আমাদের রাষ্ট্রে প্রায় সব ক্ষেত্রেই চোরের ঠ্যাং ছেড়ে দিয়ে চোরের লাঠি শক্ত করে ধরা হচ্ছে।
বড়ো নেতাদের অন্তর্জ্ঞান অসামান্য। বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত বিরক্তির সঙ্গে বলেছিলেন, সবাই পায় সোনার খনি আর আমি পেয়েছি চোরের খনি। সেই চোরের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ক্রমেই সমৃদ্ধ হয়েছে। আসলে চুরিটা আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে এমনভাবে মিশে গেছে, এ নিয়ে কেউ তেমন আর মাথা ঘামায় না। তবে মাঝেমধ্যে দু-একটি বড়ো চুরির ঘটনা ধরা পড়ে বা উদ্ঘাটিত হয়। তখন আমরা খানিকটা হইচই করি। ধর্মের বাণী স্মরণ করি। ব্যস। তারপর যেই লাউ সেই কদু। আমরা আবার চুরির মওকা খুঁজি। চুরিবিদ্যার চর্চা অব্যাহত রাখি।
করোনা ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট মহামারির সংক্রমণ রোধে গত ২৫ মার্চ থেকে সারাদেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। খাবার আর ওষুধের দোকান ছাড়া সবকিছু বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে সবাইকে ঘরে থাকতে বলা হয়েছে। এই ঘরে থাকতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন নুি আয়ের মানুষ বা যারা দিন আনে দিন খায়। বিশেষ করে গাড়িচালক, চায়ের দোকানদার, ফুটপাতের হকার, কৃষক-শ্রমিক, কুলি, মজুর, পোশাক কারখানার কর্মী, মিল-কারখানার কর্মী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীয়া। এমনকি কিছু কিছু মধ্যবিত্ত পরিবারও জীবনধারণে হিমশিম খাচ্ছেন।
কাজকর্ম বন্ধ করে ঘরে বসে থাকায় গরিব মানুষ সীমাহীন সমস্যায় পড়েছেন। তাদের উপার্জন নেই, খাবার নেই, বেঁচে থাকার ন্যূনতম সম্বল নেই। চরম দুর্যোগকবলিত এই কর্মহীন দরিদ্র মানুষদের কথা বিবেচনা করে সরকার খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি ও ওএমএসে ১০ টাকা কেজি দরে চাল, ত্রাণ, কাবিখাসহ ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের অনুদান দেওয়া শুরু করেছে। সরকার পর্যাপ্ত পরিমাণ অনুদান দিলে কী হবে, এসব অনুদান যাদের মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে, তারা নিজেরাই এসব মেরে দিচ্ছেন। ‘এ জগতে হায় সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি/ রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি’—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা কবিতার বাস্তব উদাহরণ যেন এই ত্রাণ বিতরণ কর্মসূচি। যারা এই ‘কাঙালের ধন চুরি’ করছেন, তারা কেউ রাজা-উজির নন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ডিলার। তারা স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাবশালীও বটে। তারা নিজেরা যে খুব অভাবী, দরিদ্র, তা কিন্তু নয়। তাহলে তারা গরিব মানুষের জন্য বরাদ্দ খাদ্য কেন চুরি করছেন? এরা আসলে অভাবের চোর নয়, স্বভাবের চোর। চুরি করা তাদের খাসলত। অভ্যাসও হয়তো। তারা দীর্ঘদিন ধরে গরিবের হক মেরে খেয়ে এসেছেন। ভেবেছেন, এমন সুযোগ জীবনে আর নাও আসতে পারে। কাজেই এবারও তারা সব নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু বিধি বাম। এবার আর তারা সুবিধা করতে পারেননি।
অতিদরিদ্রদের জন্য বরাদ্দ এই খয়রাতি সাহায্য ব্যাপক লুটপাট শুরু হলে সারাদেশে এর বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্ষোভের সঞ্চার হয়। ক্ষোভ ও সমালোচনার মুখে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে ত্রাণ চুরির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়। ত্রাণচোর ধরতে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়। পুলিশ সক্রিয় হওয়ায় অনেক জায়গা থেকে এই ত্রাণচোরদের গ্রেপ্তার করা হয়। ইতিমধ্যে চাল আ্ত্তসাতের ঘটনার সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৩৫ জন জনপ্রতিনিধিকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৫ জন ইউপি চেয়ারম্যান, ১৯ জন ইউপি সদস্য এবং একজন জেলা পরিষদ সদস্য।
অনেকেই এই ত্রাণচোরদের করোনার চেয়ে ঘৃণ্য মনে করছেন। এক ভদ্রলোক তো খেপে গিয়ে চোরদের উদ্দেশে বলেছেন, আপনি কেমন প্রকৃতির মানুষ? আপনার দেশে মহামারি করোনার ফলে দরিদ্র মানুষগুলো আয়-রোজগার করতে পারছেন না। সরকারি ত্রাণ যা পাবেন তা যদি আপনি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হয়ে গ্রাস করেন তাহলে আপনার বিবেক কোথায় গিয়ে দাঁড়াল? আপনি কি মানুষ, না মানুষরূপী হায়েনা? আপনার পাশের দরিদ্র প্রতিবেশী বা এমনকি আপনার দূর সম্পর্কের আ্তীীয়ও হতে পারেন। তারা খাবারের অভাবে অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন আর আপনি তাদের অনাহারের সুযোগ কাজে লাগিয়ে অঢেল সম্পত্তির মালিক হওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন! আপনার হূদয় কি এসব অসহায় নির্যাতিত, নিষ্পেষিত হতদরিদ্র মানুষদের সীমাহীন দুঃখকষ্টে একটুও কাঁদে না? চালের অভাবে অনেকের চুলায় আগুন জলছে না, অনেকে না খেয়ে থাকছে, আর আপনি তাদের প্রাপ্য সরকারি চাল আ্ত্তসাত্ করে তাদের বঞ্চিত করে রাতারাতি ধনাঢ্য ব্যক্তি হতে চান? আপনার লোভ এত বেশি কেন?
আসলে চোরদের ছাড় দিতে দিতে এমন একটা জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যে এখন চুরিটাকেই সবাই নিয়ম বানিয়ে ফেলেছে। যে কোনো চোর বা চুরির বিরুদ্ধে কথা বললেই একশ্রেণির মানুষ খেঁকিয়ে উঠে বলছেন, এই দেশে আসলে চুরিটা করে না কে? ‘সুযোগের অভাবে চরিত্রবান’ ছাড়া এ দেশে সাধু ব্যক্তি কোন সেক্টরে কয়জন আছেন? তাদের তাহলে কী হবে? বড়োলোকদেরই-বা কী হবে? এরটা মেরে, ওরটা কেড়ে, কর ফাঁকি দিয়ে, জমি আত্মসাত্ করে তবেই না বড়োলোক। সত্পথে থেকে সব নিয়ম মেনে আমাদের দেশে বড়োলোক হওয়ার তেমন কোনো সুযোগ নেই। বড়োলোক মানেই হচ্ছে—লুটপাট, চুরি, অনিয়ম। ব্যাংক-বিমাসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান চুরি-ডাকাতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বলছেন না কেন শুনি?
না, সব চোরের বিরুদ্ধে, সব ধরনের চুরির বিরুদ্ধেই কথা বলতে হবে। চুরি বন্ধ করতে হবে। তা সে ত্রাণ চুরি, চাল চুরিই হোক, আর ব্যাংক-বিমাসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ‘পুকুর চুরি’ই হোক। তবে আপাতত ত্রাণচোরদের কঠিন শাস্তি হওয়া উচিত! তাদের হাত-পা ভেঙে তিন রাস্তার মোড়ে খাঁচায় ভরে রাখা উচিত! যাতে তাদের দেখে অন্যসব শিক্ষানবিশ চোর ও ‘পুকুর চুরি’র নায়করাও হুঁশিয়ার হয়ে যায়!
n লেখক :রম্যরচয়িতা
