সিলেটের বিভিন্ন হাওরের বোরো ধান দ্রুত কেটে ঘরে তুলতে শত শত কৃষক, গৃহস্থ, ছাত্র-শিক্ষক ও রাজনৈতিক কর্মী মাঠে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। কেউবা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কেউবা স্বেচ্ছাশ্রমে। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। গতকাল শুক্রবার সকালে বৈরী আবহাওয়ায় কৃষকরা মাঠে নামতে না পারলেও দুপুরের পর নামেন। বৃহস্পতিবার সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুরের আঙ্গারুলী হাওরে ছাত্র-শিক্ষকদের নিয়ে ধান কাটায় অংশ নেন জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা। এদিকে অসহায় এক কিষাণীর জমির পাকা ধান কেটে দিয়েছেন স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুল আহাদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে জেলায় বর্তমানে নতুন ৪০টিসহ মোট ১১১টি কম্বাইন্ড হারভেস্টার মেশিন ধান কাটায় কাজ করছে। কোনো কোনো হাওরে রাতেও কৃষক ধান কাটছেন। ধান কাটায় উত্সাহ দিতে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা মাঠে দিন-রাত কাজ করছেন। জেলা প্রশাসক আরো বলেন, ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ও ভারতের মেঘালয়, আসাম, ত্রিপুরা ও বরাক অববাহিকায় ২০০ থেকে ৪০০ মিলিমিটার বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। সুনামগঞ্জ ও সিলেট জেলার প্রধান নদীগুলোর পানি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেতে পারে। তাই দ্রুত ধান কাটতে এবং হাওর রক্ষা বাঁধ ও ক্লোজারের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী নিজামুল হক ভুঁইয়া ইত্তেফাককে বলেন, হাওরে এখন ফসল কাটার ধুম। প্রশাসনের কর্মকর্তারাসহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোকজন মাঠে তদারকি করছেন। তিনি জানান, ১৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে সুনামগঞ্জের ৩৭টি হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের নির্মাণ-পুনর্নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে।
জানা গেছে, সিলেট বিভাগে এবার বোরোর ভালো ফলন হয়েছে। কিন্তু করোনা ও বৈরী আবহাওয়ার দরুণ বিস্তৃত ফসলের মাঠে এবার নবান্নের উত্সব নেই। তবে কৃষকসহ ছাত্র-জনতা ভয়কে জয় করে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক শ্রী নিবাস ইত্তেফাককে জানান, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত হাওরে ৪২ শতাংশ ও সারা বিভাগে ২৯ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। প্রশাসনের নজরদারি অব্যাহত থাকলে সব ধান ঘরে উঠবে বলে আশা করছেন তিনি। কৃষকরা জানান, বিআর-২৮ কাটা হচ্ছে। বিআর-২৯ পাকতে আরো কয়েকদিন লাগবে।
প্রতি বোরো মৌসুমে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শ্রমিক সিলেটে আসেন পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ধান কেটে দিতে। বিশেষ করে শস্যভান্ডার খ্যাত সুনামগঞ্জের ধান স্থানীয় কৃষকরা কেটে পেরে উঠতে পারেন না। এবার করোনার ভয়ে বৈশাখের শুরুতেই দেখা দেয় শ্রমিক সংকট। পরে লকডাউনের মধ্যেই শ্রমিক আসার সুযোগ করে দিলে প্রচুর শ্রমিক আসে। প্রশাসন তাদের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণে রেখেছে ও থাকার ব্যবস্থা করেছে এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে।
এদিকে বুধবার জেলার মধ্যনগরের বংশীকুন্ডা ইউনিয়নের লুঙ্গার হাওরে বিধবা নুরেজা আক্তারের জমির ধান কেটে দেন স্থানীয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। করোনা দুর্যোগ ও টাকার অভাবে তিনি ধান কাটতে পারছিলেন না। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার ইনামুল কবির ইমন বলেন, দলের বিভিন্ন পর্যায়ের লোকজন ধান কাটায় নেমে পড়েছেন।
এবার সিলেটের চার জেলায় ৪ লাখ ৭৪ হাজার ১৯৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়। এ থেকে উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ১৮ লাখ ৬৪ হাজার ২০৬ মে. টন। এর মধ্যে শুধুমাত্র সুনামগঞ্জ জেলা থেকেই ১৩ লাখ মে. টন চাল পাওয়ার আশা রয়েছে।
