করোনা ইনফেকশনে যারা আক্রান্ত হচ্ছেন, তাদের গড় বয়স ৪৭। নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত রিসার্চ নিবন্ধ থেকে এই তথ্য পাওয়া গেছে। এই বয়সেই মানুষের হূদেরাগ, হার্ট ফেইলুর, ডায়াবেটিস, ক্যানসার ইত্যাদি রোগ বেশি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কোভিড-১৯ ইনফেকশনে যাদের মৃত্যু হয়, তাদের একটি বিশাল অংশ উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হার্ট ফেইললুরজনিত শ্বাস-প্রশ্বাসের জটিলতা এবং হূিপণ্ডের ব্লকজনিত রোগে ভুগছিল। আনুষঙ্গিক অসুখগুলোর জন্য করোনায় আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে মৃত্যুর হার বেড়ে যায়। ২৫ ফেব্রুয়ারি ইউরোপিয়ান সোসাইটি অব কার্ডিওলজি তাদের নির্দেশনায় জানিয়েছে, যেসব রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করা দরকার হয়, তাদের মধ্যে ৪০-৫০ শতাংশ রোগী কোনো না কোনো হূদেরাগ কিংবা পুরোনো স্ট্রোকে আক্রান্ত। তাই যাদের এসব রোগ আছে, তাদের অধিকতর সচেতনতা অবলম্বন করা উচিত। এমনিতে করোনা ভাইরাস থেকে মৃত্যুর হার খুব বেশি নয়। কিন্তু কোমরবিডিটি (আনুষঙ্গিক অসুখ) থাকলেই বিপদ। নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত নিবন্ধে জানা যায়, চীনে যাদের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল, তাদের ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ হাইপারটেনশনে (উচ্চরক্তচাপ), ৭ দশমিক ৪ শতাংশ ডায়াবেটিসে এবং ২ দশমিক ৫ শতাংশ করোনারি হূদেরাগে ভুগছিল।
জার্নাল অব আমেরিকান মেডিক্যাল অ্যাসোশিয়েশন গত মাসে প্রকাশিত এক নিবন্ধে জানিয়েছে, করোনা ইনফেকশন ফুসফুসে নিউমোনিয়ার সৃষ্টি করলে তা থেকে ৭ দশমিক ২ শতাংশ রোগীর হূিপণ্ডের মাংসপেশিতে প্রকট প্রদাহের সৃষ্টি করতে পারে, যাকে বলা হয় মায়োকার্ডাইটিস। একই সমীক্ষায় বলা হয়েছে, এ সময় ৭ দশমিক ২ শতাংশ রোগীর রক্তচাপ অস্বাভাবিকভাবে কমে যেতে পারে এবং ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ রোগীর হূিপণ্ডের গতি অনিয়মিত হয়ে যেতে পারে, যাকে বলা হয় এট্রিয়াল ফিবরিলেশন। এ ছাড়া করোনা প্রকট হূদেরাগের সৃষ্টি করতে পারে। আমাদের জনগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশ হাইপারটেনশন, করোনারি হূদেরাগ ও হার্ট ফেইলুরে ভুগছে। তাদের অতিরিক্ত সতর্কতা গ্রহণ করতে হবে। রোগীরা এই মুহূর্তে যে যা ওষুধ খাচ্ছে তা কোনোমতেই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া বন্ধ করা যাবে না। অ্যাসপিরিনজাতীয় ওষুধ (কারভা, ইরাসপ্রিন, ইকোস্প্রিন) কিংবা ক্লোপিডগরেল শ্রেণির ওষুধ (প্ল্যাডেক্স, অ্যানক্লগ, লোপিরেল, ক্লন্ট, রিপ্লেট, ক্লোপিড, ক্লোপিলেট, ওডরেল ইত্যাদি) কখনো বন্ধ করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, কোভিড একটি প্রোকোয়াগুলেন্ট কন্ডিশন, অর্থাত্ এতে রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা বেড়ে যেতে পারে। এবং এ বিষয়ে আমেরিকান কলেজ অব কার্ডিওলজি এবং ইউরোপিয়ান কার্ডিয়াক সোসাইটির নির্দেশনা একই রকম। করোনা ডেঙ্গুর মতো নয়। এতে প্ল্যাটিলেট, অর্থাত্ অনুচক্রিকার সংখ্যা খুব একটা কমে না। এই অসুখে রক্তে লিম্ফোসাইট নামের যে কণিকা আছে, তা কমে যায়। বেটা ব্লকার, রক্তের কোলেস্টেরল কমার ওষুধ (টিজিনর, স্ট্যাকর, অ্যাটোভা, জেলপিড, লিপিটিন, লিপিকন, ফ্রেনভাস, রসুভা, রসুটিন, রোজাভেল, কোরিস্টিন ইত্যাদি) বন্ধ করা যাবে না। অনেকে লিভারে করোনা সংক্রমণের ভয়ে কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ বন্ধ করে দিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত ভুল। কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ শুধু কোলেস্টেরলই কমায় না, এই ওষুধ করোনা প্রদাহ হলে সেই প্রদাহের তীব্রতাও কমিয়ে দেয়। যে ওষুধ নিয়ে দেশি-বিদেশি সোশ্যাল মিডিয়া আর সংবাদপত্রে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে, সেই ওষুধ দুটির নাম হলো এসিই ইনহিবিটর (র্যামেস, র্যামোরিল) এবং এআরবি (অ্যানজিলক, ওসারটিল, ক্যাভাপ্রো, ডাইসিস, ডায়োভান, জিরান, টেলমা, টেলমিপ্রেস, টেলমিটান)। বলা হচ্ছে, করোনা ভাইরাস ফুসফুসের কোষের এআরবি-২ রিসেপটরের সঙ্গে মিশে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে এবং ফুসফুসে নিউমোনিয়ার সৃষ্টি করে। তাই যারা এসিই ইনহিবিটর অথবা এআরবিজাতীয় ওষুধ খায়, তাদের মধ্যে করোনার জটিলতা বাড়বে এবং মৃত্যুভয়ও বেশি হবে। এ দুটিই জীবন রক্ষাকারী ওষুধ। বাংলাদেশের লাখ লাখ উচ্চরক্তচাপ, হূদেরাগ ও স্ট্রোকের রোগী এই ওষুধ নিয়মিত খায়। ব্লাডপ্রেশারের ওষুধ বাংলাদেশের হাজার হাজার মানুষ নিয়মিত খায়। কিন্তু দেশি-বিদেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মিডিয়ার নানামুখী প্রচারণার কারণে অনেকে ভীত ও দ্বিধান্বিত হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের বক্তব্য হলো, পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত এমন কোনো তথ্যবহুল রিসার্চ পেপার ছাপা হয়নি, যার ওপর ভিত্তি করে এই ওষুধ বন্ধ করা উচিত। করোনা রোগীর শ্বাসকষ্ট কেন যাচ্ছে না, তা সন্দেহ হলে ট্রপনিন টেস্ট এবং দরকার হলে ইকোকার্ডিওগ্রাম করে হূিপণ্ডের কার্যক্ষমতা পরীক্ষা করে নেওয়া উচিত।
করোনায় আক্রান্ত প্রকট হূদেরাগীর (হার্ট অ্যাটাক) চিকিত্সা নিয়ে একটা বিভ্রান্তি বিদ্যমান। হার্ট অ্যাটাকের বিজ্ঞানসম্মত আধুনিক চিকিত্সা হলো তাত্ক্ষণিক রিং লাগানো। নির্দিষ্ট ক্যাথ ল্যাব ছাড়া করোনায় আক্রান্ত অথবা সন্দেহজনক রোগীর তাত্ক্ষণিক রিং লাগানো অনেক হাসপাতালেই সম্ভব হবে না। আর তা ছাড়া করোনা পজেটিভ না নিগেটিভ তা জানতেও কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। হার্ট অ্যাটাকের চিকিত্সা কত দ্রুত শুরু হলো তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এবার চীনে সিদ্ধান্ত ছিল ‘থ্রম্বোলাইসিস ফার্স্ট’। রোগী মোটামুটি সুস্থ ও স্বাভাবিক হলে পরে অ্যানজিওগ্রাম। আমাদের দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও থ্রম্বোলাইসিসের জন্য মেটালাইস নামের একটি ইনজেকশন পাওয়া যায় এবং সব ডাক্তারই এই ইনজেকশন দিতে পারে। সুতরাং ভয়ের কিছু নেই। এই ইনজেকশন প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে ব্লক সরিয়ে বা গলিয়ে দিতে পারে। তাই চিকিত্সায় কোনো সংকট নেই। অতিরিক্ত মৃত্যুভয়ও নেই। রিং পরেও লাগানো যাবে।
লেখক :সিনিয়র কনসালটেন্ট, কার্ডিওলজিস্ট, ল্যাব এইড কার্ডিয়াক হাসপাতাল
