রেমিট্যান্স ও প্রবাসীদের রক্ষায় পরিকল্পনা প্রয়োজন

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০২০, ২২:১০

শত সমস্যা কিংবা প্রতিকূলতার মধ্যেও বৈদেশিক মুদ্রায় বাংলাদেশ তুলনামূলক নিরাপদ থাকে মূলত প্রবাসী বাংলাদেশিদের কারণে। পৃথিবীর ১৬৯টি দেশে বাংলাদেশের ১ কোটিরও বেশি মানুষ কাজ করিতেছেন। ইহার মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশেরই কর্মসংস্থান মধ্যপ্রাচ্যে। করোনায় যখন সারা বিশ্বের বৃহত্ অংশ লকডাউন হইয়া রহিয়াছে, তখন প্রবাসী বাংলাদেশিরাও পড়িয়াছেন সমূহ বিপদে। আমেরিকা, ব্রিটেন, ইতালি, মধ্যপ্রাচ্য ও সিঙ্গাপুরে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি করোনায় আক্রান্ত হইয়াছেন। নিউ ইয়র্ক, লন্ডন, ইতালির বিভিন্ন শহরসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে মারা গিয়াছেন অসংখ্য প্রবাসী। এই মৃত্যু একদিকে যেমন আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতির, তেমনি কাজকর্মের বিভিন্ন জটিলতায় টান পড়িয়াছে প্রবাসী আয়-উপার্জনে। তাহার প্রভাব পড়িতেছে আমাদের রেমিট্যান্সেও। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে গত মার্চ মাসে প্রবাসীরা ১২৮ কোটি ৬৮ লক্ষ ডলার দেশে পাঠাইয়াছেন, যাহা বিগত ১৫ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন।

আমাদের জিডিপিতে অন্তত ১০ শতাংশ অবদান প্রবাসী আয়ের। কাজেই আমাদের প্রবাসী আয় যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যাহা ইতোমধ্যেই শুরু হইয়া গিয়াছে, তবে তাহা দেশের অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত হিসাবে দেখা দিবে। বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির প্রভাবে প্রবাসীদের টাকা পাঠাইবার পরিমাণ আরো কমিবে, তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। এমনকি করোনার আতঙ্ক ছাপাইয়া বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি চাকুরি হারাইবার আশঙ্কায় নির্ঘুম রাত্রি যাপন করিতেছেন। মধ্যপ্রাচ্যে তেলের বাজারমূল্যে ব্যাপক ধাক্কা লাগায় তাহার প্রভাব পড়িতে যাইতেছে বাংলাদেশি শ্রমিকদের উপর। তেলনির্ভর অর্থনীতির কারণে দেশগুলি মন্দার কবলে পড়ায় সৌদিতে বহু প্রতিষ্ঠানে বেতন কাটা হইতেছে, এমনকি কর্মী ছাঁটাইও শুরু হইয়াছে। করোনা সুনামি আর কতদিন অব্যাহত থাকিবে, এখনো তাহা কেহ বলিতে পারিতেছে না। সুতরাং আমরা এখনো জানি না আমাদের কী পরিমাণ প্রবাসী শ্রমিক তাহাদের কাজ হারাইবে। ইতোমধ্যে তিন মাসের ক্ষতি যদি হিসাব করা যায়, তবে দেখা যাইতেছে দেড় লক্ষাধিক লোক কর্মসংস্থান হইতে বঞ্চিত, দুই লক্ষাধিক লোক ফেরত আসিয়াছে। ইহার মধ্যে সবচাইতে আশঙ্কার তথ্য হইল, বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি প্রায় ১ কোটি লোকের মধ্যে অন্ততপক্ষে ৫০ লক্ষ লোকের এই মুহূর্তে কোনো কাজ নাই। মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও ইউরোপের চিত্রও ভালো নহে। বর্তমানে ২ লক্ষ ৬০ হাজারের মতো বাংলাদেশি ইতালিতে রহিয়াছেন; কিন্তু দেশটির বেশির ভাগ শহরে জনকোলাহল থামিয়া গিয়াছে। চরম সংকটে পড়িয়াছে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা। সেই সংকট বাংলাদেশিদের জন্য করোনা বোঝার ওপর শাকের আঁটি হইয়া দেখা দিয়াছে। এই দিকে সিঙ্গাপুরে করোনা আক্রান্তদের ৪০ শতাংশই বাংলাদেশি। করোনা ভাইরাস মহামারিতে বিশ্বব্যাপী লকডাউনের কারণে অচলাবস্থা দেখা দিয়াছে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি খাতেও। প্রবাসীদের আয় তো কেবল অর্থনীতিতেই অবদান রাখে না, সামাজিক স্থিতিশীলতায়ও ইহার ব্যাপক গুরুত্ব বহন করে। প্রবাসী এই ১ কোটি মানুষের উপার্জিত অর্থে অন্নসংস্থান হয় এই দেশের কমপক্ষে ৪ কোটি মানুষের।

করোনা-পরবর্তী আগামী বিশ্ব হইবে অত্যন্ত জটিল। তাহা মোকাবিলার জন্য সঠিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন দরকার।