দশ দিগন্তে g আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
এক মণীষী বলেছিলেন, ‘আমি রাষ্ট্রবিহীন সংবাদপত্রের কথা কল্পনা করতে পারি, কিন্তু সংবাদপত্রবিহীন রাষ্ট্রের কথা কল্পনা করতে পারি না।’ আধুনিক যুগের জন্য কথাটা শতভাগ সত্য। করোনা ভাইরাসের দাপটে আজ উন্নত-অনুন্নত নির্বিশেষে সব রাষ্ট্রই প্রায় সংবাদপত্রবিহীন হতে চলেছে। ইলেকট্রনিক মিডিয়া অবশ্য এখনো চালু আছে। কিন্তু প্রিন্টিং মিডিয়ার বদলে কেবল ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় পাঠকদের সংবাদ ও সংবাদ ভাষ্যের পিপাসা নিবারণ অনেকটা দুধের পিপাসা ঘোলে মেটানোর মতো।
কোভিড-১৯ এর মহামারিতে বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রের সংবাদপত্র এবং সংবাদমাধ্যমের কর্মীরা আক্রান্ত। যদি করোনার মহামারি আরো কিছুদিন চলে তাহলে বিশ্বের সব দেশেই সংবাদপত্রবিহীন রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে। তা যদি হয় তাহলে সেটা হবে আধুনিক সভ্য জগতের মৃত্যু। এই সর্বনাশ রোধ করার জন্য প্রতিটি দেশেরই উচিত জাতীয় পর্যায়ে এবং আন্তর্জাতীয় পর্যায়ে দ্রুত কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ।
এই ব্যাপারে বাংলাদেশে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন ঢাকার দৈনিক জনকণ্ঠের উপদেষ্টা সম্পাদক তোয়াব খান। ঢাকার একটি দৈনিকে গত শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) প্রকাশিত তার ‘মানুষের সঙ্গে সংবাদপত্রকেও বাঁচাতে হবে’ শীর্ষক লেখায় এই ব্যাপারে জাতীয় পর্যায়ে কিছু ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন। সংবাদপত্র ও সংবাদ কর্মীদের বাঁচানোর জন্য তিনি কিছু প্রস্তাবও দিয়েছেন এগুলো বিবেচনা যোগ্য।
এটা ঠিক যে, জরুরি সার্ভিসের কর্মীদের মতো সংবাদপত্রের রিপোর্টিং সেকসনসহ বেশ কটি সেকসনের কর্মীদেরই বাইরে ছোটাছুটি করতে হয়। আর এই কাজ করতে গিয়ে ঢাকার মতো বিশ্বের অন্যান্য শহরেও ইলেকট্রনিক ও প্রিন্টিং মিডিয়ার কর্মীরা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। পত্রিকার পৃষ্ঠা সংখ্যা ও বিজ্ঞাপন কমে গেছে। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলোর শহরাঞ্চলে কাগজের সাকুলেশন মারাত্মকভাবে কমেছে। কারণ, হকাররা কাগজ বিক্রি ও বিতরণের জন্য আর রাস্তায় বেরোতে চায় না। তাছাড়া রয়েছে ঘরে থাকার জন্য সরকারি নির্দেশ।
ব্রিটেনের মতো উন্নত দেশের রাজধানী লন্ডনে থাকি। এখানে টাইমস, গার্ডিয়ানের মতো কাগজের পৃষ্ঠা সংখ্যা কমেছে। বিজ্ঞাপণ কমে গেছে। সার্কুলেশনও নিশ্চয়ই কমে গেছে। যেহেতু ইউরোপ-আমেরিকার বড়ো বড়ো সংবাদপত্র শিল্পের মালিকানা বড়ো বড়ো মনোপলি বা কার্টেলের হাতে সেজন্য তারা এখনো সরকারি সাহায্য চাননি। কিন্তু ভবিষ্যতে চাইবেন না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
তোয়াব খান লিখেছেন, ‘সংবাদপত্রের মালিক, কর্মচারী, সাংবাদিক সবাইকেই সংবাদপত্রের আয় থেকেই জীবনধারণ করতে হয়। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় সব আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো বেতন দিতে হিমশিম খাচ্ছে।’ আমি তোয়াব খানের এই অভিমতের সঙ্গে সহমত পোষণ করি। কেবল একটি বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করি। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানের মতো দেশগুলোর সংবাদপত্র শিল্পের মালিকানা তা ইলেকট্রনিক হোক আর প্রিন্টিং হোক আগের মতো ব্যক্তিগত বা রাজনীতিকদের হাতে নেই। বড়ো বড়ো শিল্পগোষ্ঠীর মালিকানায় রয়েছে সংবাদপত্রশিল্প। সংবাদপত্রের কর্মচারী, সাংবাদিক সবাইকেই সংবাদপত্রের দেওয়া মাসিক বেতনের দ্বারাই জীবন ধারণ করতে হয়। কিন্তু বড়ো সংবাদপত্র শিল্পের মালিকদের তা করতে হয় না। তারা লাভজনক বড়ো বড়ো শিল্পকলকারখানার মালিক। সংবাদপত্রের আয় দ্বারা জীবনধারণ দূরের কথা, তারা অনেকে তাদের সংবাদপত্র বাঁচিয়ে রাখতে ভর্তুকি দেন।
এই অবস্থায় বাংলাদেশের সংবাদপত্রের মালিকদের সংগঠন নোয়াবের সব সুপারিশের সঙ্গে আমি সহমত পোষণ করি না। এই জাতীয় দুর্যোগের সুযোগ নিয়ে সরকারের কাছে সব ব্যাপারেই হাত পাতার চাইতে এই বিগ বিজনেসগুলোকে নিজেদের দায়িত্ব পালনের জন্য আবেদন জানাই। লন্ডন, প্যারিস ও নিউ ইয়র্কের প্রেস-ব্যারনদের মতো তারা জরুরি তহবিল গঠন করে সংবাদপত্র শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার ব্যবস্থা করতে পারেন। ব্যক্তি মালিকানাধীন কাগজগুলোকে ক্যাটাগরিভুক্ত করে জরুরি সাহায্য দিতে পারেন সরকার। ইতিমধ্যেই করোনার অজুহাত দেখিয়ে ঢাকার দুটি ব্যক্তিমালিকানাধীন কাগজ বন্ধ হয়ে গেছে। যেসব ভুয়া সংবাদপত্র মরতে চায় তাদের লাইফ সাপোর্ট দিয়ে লাভ নেই, দেখতে হবে তাদের সাংবাদিক ও কর্মচারীরা যাতে কোনো প্রতারণার শিকার না হয়।
তোয়াব খান একজন প্রবীণ সাংবাদিক। দীর্ঘকাল সংবাদপত্র শিল্পের সঙ্গে জড়িত। এই শিল্পের সমস্যা ও অসুবিধাগুলো তিনি ভালোভাবে জানেন এবং সেই সমস্যাগুলো ভালোভাবে তুলে ধরেছেন। ইতিমধ্যে নোয়াব, সম্পাদক পরিষদ এবং সাংবাদিক ইউনিয়নও তাদের দাবি-দাওয়া উত্থাপন করেছে। দেশের সংবাদপত্র শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে সরকারের উচিত এই দাবি-দাওয়া যথাসম্ভব পূরণের দিকে দৃষ্টি দেওয়া। এই দাবির মধ্যে রয়েছে, সরকার বিভিন্ন সংস্থার কাছে বিজ্ঞাপন বাবদ যে বিপুল টাকা অপরিশোধিত রয়েছে, তা অবিলম্বে শোধ করা। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সংবাদপত্রের ট্যাক্স প্রদান সাময়িকভাবে মওকুফ রাখা এবং বিদেশ থেকে কাগজ, কালি ইত্যাদি আনার ক্ষেত্রে সুযোগসুবিধা বাড়ানো।
সবচাইতে সংকটাপন্ন অবস্থা জেলা-উপজেলা শহরের সংবাদপত্রগুলোর। করোনার জন্য সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর হকারেরা তাদের বাড়িতে চলে গেছে। সংবাদপত্রের কাটতি ও বিজ্ঞাপন একেবারেই পড়ে গেছে। কাগজগুলো বন্ধ হতে চলেছে। সরকারের সাহায্য এখানেও প্রয়োজন। সংবাদপত্রের মালিক, কর্মচারী, সাংবাদিকদের সাহায্য দানের ক্ষেত্রে প্রেস কর্মচারীদের কথাও যেন মনে রাখা হয়।
তোয়াব খান সাংবাদিকদের জন্য নানা আর্থিক প্রণোদনা এবং সংবাদপত্র শিল্পের মালিকদের জন্য স্বল্পতম সুদে ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব তার লেখাতেও উল্লেখ করেছেন। এটা ভালো প্রস্তাব। তবে মনে রাখতে হবে এবার করোনা তার হামলায় শ্রেণিভেদ, গরিব-ধনী ভেদ করেনি। সামাজিক ঐক্য দ্বারাও এই দানবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সুযোগ রাখেনি। সব মানুষই এখন সমাজবিচ্ছিন্ন। অনেকে আবার পরিবার বিচ্ছিন্নও। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই অবস্থায় সমাজের নিচু ও একেবারেই অভাবী শ্রেণিগুলোর দিকে নজর দিতে হবে আগে। এজন্য অধিক দুর্দশাগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিনা সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণদান ও সাহায্যের ব্যবস্থা করা উচিত।
দেশে দেশে সংবাদপত্র শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগ প্রয়োজন। যেসব দেশে গণতন্ত্র দুর্বল বা চক্রান্তের সম্মুখীন, সেসব দেশে এই উদ্যোগ আরো বেশি প্রয়োজন। গণতন্ত্র ও গণ-অধিকার রক্ষার সংগ্রামে সংবাদপত্র অগ্রগামী সৈনিক। বার্ট্রান্ড রাসেল বলেছেন, ‘সংবাদপত্র ছাড়া সভ্যতা অচল।’ তাই উন্নত-অনুন্নত নির্বিশেষে সব দেশে গণতন্ত্র ও সভ্যতার বাহন সংবাদপত্র। অনুন্নত ভাষাকে উন্নত করে সংবাদপত্র। বাংলাদেশে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে, বাংলা লিপি রক্ষা, রবীন্দ্রসংগীত রক্ষার সংগ্রামে সর্বোপরি ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে সংবাদপত্রের ভূমিকা আমরা দেখেছি। সুপার পাওয়ার আমেরিকার ওয়াটার গেট কেলেঙ্কারির খবর প্রকাশ করে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের পতন ঘটিয়েছিল একটি সংবাদপত্র ওয়াশিংটন পোস্ট। বাংলাদেশের স্বাধিকার অর্জনে মানুষ এখনো শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে সম্পাদক মানিক মিয়ার রাজনৈতিক মঞ্চের লেখনীর কথা।
মানুষ সামাজিক জীব। তার সামাজিক যোগাযোগ রক্ষার জন্যও সংবাদপত্রের প্রয়োজন সমধিক। এই সামাজিক বিচ্ছিন্নতার সময়ে তা আরো বেশি প্রয়োজন। তাই পৃথিবীর সব দেশে সংবাদপত্র শিল্পকে রক্ষার জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্রহণ অত্যাবশ্যক। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থা রয়েছে। কোনো দেশের সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, বাক স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হলে তারা প্রতিবাদ জানান এবং আন্দোলনে নামেন। এবার তো শুধু সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নয়, তার অস্তিত্ব বিপন্ন হয়েছে। সংবাদপত্র শিল্পকে রক্ষার জন্য এবার এই আন্তর্জাতিক সংস্থার উচিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্রহণ। তাদের উদ্যোগের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার উদ্যোগও যুক্ত হওয়া উচিত। বিশ্বে মানবাধিকার রক্ষা ও সংরক্ষণের জন্য স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন।
বিশ্বের স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ ও অধিকার আদায়ের আন্দোলনে শেখ হাসিনা এখন শীর্ষ বিশ্ব নেতাদের একজন। বিশ্বকে পরিবেশ দূষণ থেকে মুক্ত করার সংগ্রামে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তিনি নেতৃত্ব দিয়ে প্রশংসিত হয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিতে কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করাবিষয়ক ভার্চুয়াল সম্মেলনে (এই সম্মেলনের আয়োজন করে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম) শেখ হাসিনা করোনা প্রতিরোধে পাঁচটি প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন। তার দিকে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের দৃষ্টি এখন নিবদ্ধ। শেখ হাসিনার কাছে আমার আবেদন, তিনি বিশ্বের স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সংবাদপত্র শিল্পের সংকট মুক্তির জন্য পথপ্রদর্শকের ভূমিকা গ্রহণ করুন। দেশের সংবাদপত্র শিল্পে করোনার দরুন সৃষ্ট মহাসংকট সম্পর্কে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করায় প্রধান সাংবাদিক তোয়াব খানকেও আমার অভিনন্দন।
[লন্ডন, ২৫ এপ্রিল, শনিবার, ২০২০]
