রোকসানা সুইটি
১৯৭১ সালের কথা, দেশের অবস্থা খুবই খারাপ ছিল তখনকার সময়। এখন ২০২০ সাল, দেশের অবস্থা ঠিক তেমনই খারাপ। যুদ্ধে শামিল হচ্ছে লক্ষ কোটি মানুষ। পুরো বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে করোনা নামক ছোটো একটি শক্তিশালী ভাইরাস। অসহায় মানুষ আজ দিশেহারা। নিজ গৃহে নিজেকেই বন্দি করে রেখেছেন। শোকে স্তব্ধ হয়ে আছে পুরো বিশ্ব।
আমি ৭১ সালে হায়নাদের তাণ্ডবলীলা দেখিনি! সন্তান হারা মায়ের আহাজারি কিংবা সম্ভ্রম হারানো বোনের গগন বিদারি চিত্কারে বাতাস কতটা ভারী হতো তা শুনেছি। শুনেছি বাতাসে লাশের গন্ধ ভেসে বেড়াত তখন। শকুনরা উদ্গ্রীব হয়ে বসে থাকত মৃত পশু, পচন ধরা লাশের অপেক্ষায়...! মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের পাতায় লেখা এসব কাহিনি আমরা জেনেছি!
শুনেছিলাম জীবন বাঁচাতে, দেশকে স্বাধীনতা এনে দিতে কতটা ত্যাগ স্বীকার করেছিল মুক্তিযোদ্ধারা। আমি অবাক হয়ে দেখছি আবারও বেঁচে থাকার লড়াইয়ের সেই প্রতিচ্ছবি ! কিছুটা একই রকম। তখন যুদ্ধ হয়েছে দৃশ্যমান শত্রুর সঙ্গে এখন হচ্ছে অদৃশ্য শত্রুর সঙ্গে।
নীরব মহামারির কবলে পড়ে মারা যাচ্ছে শত শত তাজা প্রাণ। খেটে খাওয়া মানুষের নীরব হাহাকার! কিছু মানুষরূপী হায়েনা ভোগ করছে নিম্ন আয়ের মানুষের প্রাপ্য ত্রাণসামগ্রী। কেড়ে নিচ্ছে তাদের মুখের গ্রাস। খাবারের খোঁজে বের হওয়া ৯ বছরের শিশু ধর্ষিত হচ্ছে! দেশের এমন খারাপ সময়েও মানুষ কীভাবে এসব করতে পারে ভাবতে অবাক লাগে।
অদৃশ্য শক্তির কাছে হেরে না গিয়ে বেঁচে থাকার যুদ্ধে শামিল হয়েছে সমগ্র বিশ্ববাসী। আজ কোনো ভেদাভেদ নেই ধনী গরিবের মধ্যে। করোনা সবার জন্যই মৃত্যুপুরীর দরজা খুলে বসে আছে। ধনী গরিব একাত্মভাবে লড়াই করছে বেঁচে থাকার জন্য। নীরব দুর্ভিক্ষ দেখছে কেবল নিম্নবৃত্ত খেটে খাওয়া হতদরিদ্র মানুষেরা। সামর্থ্যবানরা যখন অট্টালিকায় বসে উপভোগ করছে হোম কোয়ারেন্টাইন। তারা তখন রাস্তায় নেমেছে পেটের ক্ষুধায় একমুঠো খাবারের আশায়। ১০ টাকায় কেনা চালের জন্য কাঠফাটা রৌদ্রে দগ্ধ হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকছে মানুষের বিশাল লাইন। মধ্যবিত্ত মানুষের অবস্থা আরো শোচনীয় তারা না পারছে বলতে না পারছে সহ্য করতে। শুধুই ভালো থাকার অভিনয় করে যাচ্ছে সবার সঙ্গে। স্বজনের কাছে যাওয়া যায় না, তাদের বাঁচার আকুতিও কেউ শোনে না। করোনার হিংস্র থাবায় মানুষকে করে দিয়েছে স্বার্থপর। বাবার লাশ রেখে পালাচ্ছে সন্তান। মাকে রেখে আসছে জঙ্গলে। মরে গিয়ে তিনি হবেন পশুর খাবার। মানবতা আজ ডুকরে কাঁদছে। পৃথিবীটা রোগ আক্রান্ত হয়ে মানুষকে করে তুলেছে নিষ্ঠুর।
বিদেশ থেকে অবৈধ প্রবাসীদের পাঠিয়ে দিচ্ছে। জানি না আমাদের জন্য আর কত কী অপেক্ষা করছে। এসব বেকার মানুষেরা কীভাবে চলবে, কীভাবেই বা সংসার চালাবে তা গভীর চিন্তার বিষয়। এখনো অমানুষের দল গরিবের ত্রাণ চুরি করছে। মানবতা ডুকরে কাঁদছে কষ্টে থাকা মানুষের দীর্ঘশ্বাসে! ৭১ সালের রাজাকার এখনকার চাল চোর একই রূপে আবারও ফিরে এসেছে। কতটা অমানুষ হলে এই অবস্থায় ত্রাণ চুরি করতে পারে! বড়ো বড়ো রাষ্ট্র যেখানে হার মেনেছে করোনার কাছে, সেখানে আমাদের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্র কীভাবে বাঁচাবে এই মহামারি থেকে মানুষকে। তাছাড়া এর তাণ্ডবলীলা কবে শেষ হবে তারও তো কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবে সরকারের প্রশংসা না করাটা অকৃতজ্ঞতার শামিল হবে। সরকার যথেষ্ট সহযোগিতা করছে। কিন্তু কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষের জন্য তা পুরোপুরি করা সম্ভব হচ্ছে না। সরকারের উচিত সেনাবাহিনীর হাতেই ত্রাণ বিতরণের ব্যবস্থা করা, তবেই সবার মাঝে তা সঠিক বণ্টনের মাধ্যমে পৌঁছানো সম্ভব।
ইতিহাস কথা বলে যায়...। হ্যাঁ আমরাই এখন সেই বেঁচে থাকার লড়াইয়ের জীবন্ত ইতিহাসের সাক্ষী হব, নয়তো বা নিজেই হব ইতিহাস!
n লেখক :সাবেক শিক্ষার্থী,
নোয়াখালী সরকারি মহিলা কলেজ
