বদলে গেছে দৃশ্যপট

চকের ইফতার বাজারে খাঁ খাঁ শূণ্যতা

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০২০, ২২:৩১

আনোয়ার আলদীন

পবিত্র মাহে রমজানের উত্সবমুখর ইফতারির বাজারের চিরচেনা দৃশ্যপট স্তব্ধ করে দিয়েছে করোনা ভাইরাসের ভয়াল প্রাদুর্ভাব। রাজধানীবাসীর বর্ণাঢ্য ইফতারির অন্যতম আকর্ষণ ছিল পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী চকবাজার। মুঘল আমল শেষ হলেও মুঘলদের বাহারি ইফতারের রসনাবিলাসী পসরার টানে বিকাল হলেই সেখানে ছুটত নগরবাসীর অনেকেই। ৪০০ বছরের পুরোনো ঢাকার চকের খানদানি ইফতার বাজারে সেই হাঁকডাক, সেই রোশনাই, সেই বিপুল ভিড়ভাট্টা-বিকিকিনির ব্যস্ততা নেই, নেই মুখরোচক খাবারের সুবাস। ‘বড়ো বাপের পোলায় খায়, ঠোঙ্গায় ভইরা লইয়া যায়’—গালভরা সব গর্ব নিথর হয়ে গেছে। গতকাল পয়লা রোজায় চকবাজার কিংবা বেইলী রোডের ইফতার বাজারে ছিল একবারে ভিন্ন দৃশ্যপট। চার দিকে খাঁ খাঁ শূন্যতা।

চকবাজারের শাহি মসজিদের পাশে দু-চারজন ইফতার নিয়ে বসলেও পুলিশ এসে তাদের উঠিয়ে দেয়। ইফতারির পসরা নিয়ে কেউ বসতে পারেনি। কেবল ঢাকা নয়, দেশের কোথাও ছিল না ইফতার বাজারের কেনাবেচার ধুম। এ এক অন্য রকম রমজান মাস উদ্যাপন করছে দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের ভয়ে সরকার রাজধানীসহ সারাদেশে ইফতারসামগ্রীর বাজার বসানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। ফলে রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারসহ কোথাও ইফতারি বাজার বসেনি। জমজমাট ইফতারি বাজারবিহীন গতকালের চকবাজারকে দেখলে অস্ফুট স্বরে মুখ থেকে বেরিয়ে আসে এ ‘কোন চকবাজার? অথচ বহু বছর ধরে গোটা চকবাজারের রাস্তাঘাট দখল করে বসত বঁটি কাবাব, সুতা কাবাব, রেশমি কাবাব, জালি কাবাব, টিকিয়া, মুরগি মোসাল্লাম, খাসির লেগ রোস্ট, গরুর ভুনা মাংস, আস্ত কোয়েল ভুনা, শাহী জিলাপি, মাঠা, শরবত, হালিম ও বিভিন্ন ধরনের ফলমূলসহ খাবারের পসরা।

প্রতি রমজানে চিরচেনা চকবাজারের ইফতারের বাজারের সঙ্গে এ চকবাজারের কোনো মিল নেই। দেশ স্বাধীনের পর থেকে গত বছর পর্যন্ত সময়ের পরিক্রমায় নতুন ঢাকার বিভিন্ন স্থানে, পাঁচ তারকা হোটেল ও অনেক উন্নতমানের রেস্টুরেন্টে অনেক ইফতার সামগ্রী তৈরি ও বিক্রি হলেও সব ছাপিয়ে চকবাজারের ইফতার সবার কাছে প্রিয়। একই বাজারে এত ইফতারের আইটেম আর অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। তাই নগরবাসীর অনেকেই দূর-দূরান্ত থেকে ইফতার কিনতে চকবাজারে ছুটে আসেন। বিশেষ করে রমজানের প্রথম দিনে মানুষের ভিড়ে পা রাখাই দায় হয়ে পড়ে চকবাজারে। সেহরির পর থেকেই চকবাজারের ইফতারসামগ্রী তৈরির কারিগররা ব্যস্ত হয়ে পড়েন। দিনের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে দোকান খুলে প্রস্তুতি শুরু হয়। সকাল ১০টার পর থেকে অসংখ্য চুলায় হরেক আইটেমের ইফতারসামগ্রী ভাজা শুরু হয়। জোহরের নামাজের পর থেকে নামে ক্রেতাদের ঢল। কিন্তু করোনা ভাইরাসের কারণে চকবাজারে আজ ইফতারি বাজার বসেনি। চারদিকে সুনসান নীরবতা। এমন দৃশ্য আগে কখনো দেখেননি বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দা বৃদ্ধ মিন্টু সরদার।

তিনি বললেন, ৫৮ বছর ধরে চকবাজারে ইফতার বিক্রি করি। কিন্তু এবারের মতো জনশূন্য কখনো দেখিনি। চকবাজারের অপর ব্যবসায়ী সোহেল মিয়া বলেন, এখানে বহু বছর ধরে ব্যবসা করি। আমার বাবাও এখানে ব্যবসা করতেন। আমার জীবদ্দশায় তো বটে, আমার বাবাও এরকম পরিস্থিতি চকবাজারে দেখেননি। চকবাজারের পুরোনো ইফতার বিক্রেতা হাজি কাসেম আলী জানান, প্রতি বছরই রোজার এই সময়টায় দম ফেলার ফুরসত থাকত না। সেই সকাল থেকেই শুরু হতো ইফতারি তৈরির ব্যস্ততা। দোকানে এই এক মাসের জন্য তাকে দুই-তিন জন লোক বেশি রাখতে হতো। না হলে কুলানো যেত না। কিন্তু এবার হাজি কাসেমের মন বিষণ্নভরা। দোকান বন্ধ। কর্মচারীরা গ্রামে চলে গেছে। তিনিও প্রায় এক মাস ধরে হাত-পা বেঁধে ঘরে বসে আছেন। তবু সকালে বেরিয়ে দোকানের সামনে এসে ঘুরে যান। দুপুরে বেরিয়ে আবার বাসায় চলে যান। হাজি কাসেম বলেন, এইবার তো কিচ্ছু নাই। সব ফাঁকা। মানুষই নাই, দোকান নাই, ইফতার নাই। করোনার জন্য সব বন্ধ। রুজি-রোজগারও নাই। ঈদ যে কেমন হইব আল্লাহ জানেন।