জানা-অজানা

এয়ারস্পোরা

আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০২০, ১৯:৫৬

সুশান্ত কুমার রায়

এয়ারস্পোরা হলো বিভিন্ন উদ্ভিদের পরাগরেণু, অতিকায় ক্ষুদ্র শৈবাল, ছত্রাক কোষ, ব্যাকটেরিয়া স্পোর, প্রোটোজোয়া সিস্ট এবং আণুবীক্ষণিক ভাইরাস কণা। বায়ুমণ্ডলের অদৃশ্য বায়ুতে ছড়িয়ে থাকা অতি সূক্ষ্ম ও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র স্পোর বা কণাগুলোকে একত্রে ‘এয়ারস্পোরা’ বলে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল আপাত দৃষ্টিতে পরিষ্কার বা স্বচ্ছ মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তা নয়। বায়ুমণ্ডলে অবিরত অসংখ্য ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণুজীব মুক্তভাবে খোলা বাতাসে ভেসে বেড়ায়। তবে অধিকাংশ বায়ুবাহিত কণা হলো স্পোর বা রেণু। এসব রেণু বা বায়ুবাহিত কণা কিছু সময়ের জন্য পরিবেশে টিকে থাকে এবং অতি অল্প সময়ের মধ্যে দ্রুত বিস্তার লাভ করে। এই এয়ারস্পোরাগুলো বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন অনুপাতে বিরাজ করে। এয়ারস্পোরাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড়ো কণা হলো পরাগরেণু, যার সর্বোচ্চ ব্যাস ২০০ মাইক্রন। তবে অধিকাংশ পরাগরেণুর ব্যাস ২০ মাইক্রন থেকে ৫০ মাইক্রন হয়ে থাকে। অন্যদিকে অধিকাংশ ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া কোষের ব্যাস যথাক্রমে ৩ মাইক্রন থেকে ৩০ মাইক্রন ও ১ মাইক্রন। তবে ভাইরাস কণার ব্যাস ০.১ মাইক্রন হয়। বায়ুপ্রবাহের ওপর বিভিন্ন ধরনের এয়ারস্পোরার অবস্থান নির্ভর করে। বায়ুমণ্ডলে বিরাজমান এয়ারস্পোরা সব সময় সব জায়গায় একই মাত্রায় বা অনুপাতে থাকে না। বিভিন্ন স্থানে বাতাসের গতির কমবেশির কারণে উপস্থিতির পরিমাণও কমবেশি হয়ে থাকে। প্রত্যেকটি  অণুজীবের একটা নিজস্ব ওজন থাকায় একেক ধরনের এয়ারস্পোরা বায়ুমণ্ডলের এক এক জায়গায় অবস্থান করে। যে সমস্ত এয়ারস্পোরা দ্রুতগতিতে মাটিতে পতিত হয় সেগুলো কিছুটা ভারী। তবে যে সমস্ত এয়াস্পোরার আকার ১ মাইক্রনের নিচে সেগুলো মাটিতে পতিত না হয়ে মুক্তভাবে বাতাসে ভেসে বেড়ায়।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো ভূপৃষ্ঠের ১৮ থেকে ২৭ কিলোমিটার ওপরেও ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের জীবন্ত কোষ পাওয়া গেছে। এয়ারস্পোরা বা অণুজীবগুলো অনেক দূর পর্যন্ত অতিক্রম করে সেই এলাকার সুস্থ ও সবল উদ্ভিদ এবং প্রাণী দেহে রোগ সৃষ্টি করতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগের প্রকোপ এত বাড়ে, যা অবশেষে সেখানে রোগ মহামারি আকার ধারণ করে। বর্তমানে পৃথিবীতে করোনা ভাইরাসের কারণে হাজার হাজার লোক মারা যাচ্ছে। হাসপাতালের বেড, রেলওয়ে স্টেশন, জনাকীর্ণ হাট-বাজার, থিয়েটার, খেলার মাঠ, সিনেমা হল ছাড়াও অন্য কোনো জনাকীর্ণ এলাকায় এয়ারস্পোরা বা অণুজীবগুলোর মাত্রা থাকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। শুধু একটি হাঁচির মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে ০.১ মাইক্রন আয়তনের ১ মিলিয়ন ড্রপলেটস বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, যার প্রভাব কোনো সুস্থ মানুষের জন্য নয়, বরঞ্চ যে কোনো সন্নিকটবর্তী প্রাণীর জন্য মারাত্মক হতে পারে। তাই হাঁচি দেওয়ার সময় রুমাল বা এমন কোনো কিছু ব্যবহার করা উচিত যাতে করে চারদিকে ছড়িয়ে না পড়ে।

এয়ারস্পোরাতে বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া কোষ ও ভাইরাস কণা থাকায় তা মানবদেহে বিভিন্ন ধরনের রোগ সৃষ্টি করে। যক্ষ্মা, ডিপথেরিয়া ও হুপিংকাশির মতো মারাত্মক কিছু রোগ বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সংঘটিত হয়ে থাকে। এছাড়াও হাম, ইনফ্লুয়েঞ্জা ও বসন্ত এবং অন্যান্য কিছু রোগ ভাইরাসের আক্রমণে হয়। ব্যাকটেরিয়া থেকে ভাইরাসজনিত রোগ অনেকটা বেশি মারাত্মক হয় এই কারণে যে তা বাতাসের মাধ্যমে দ্রুত জীবদেহে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এজন্য ভাইরাসজনিত রোগকে ছোঁয়াচে বা সংক্রামক বা সংক্রমণজনিত রোগও বলা হয়। জীবদেহে রোগ সৃষ্টির পাশাপাশি খাদ্যদ্রব্যকেও দূষিত করে। তাই  খাদ্যদ্রব্যকে সব সময় ভালোভাবে পরিষ্কার পাত্রে রেখে ঢেকে রাখা উচিত, যাতে করে সেগুলো এয়ারস্পোরা দ্বারা আক্রান্ত না হয়।