সুমনা মৃধা
বিশ্ব এখন কার্যত বিচ্ছিন্ন। বৈশ্বিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যও হুমকির মুখে। বিশ্বে যথাক্রমে প্রথম ও তৃতীয় বৃহত্তম চাল রপ্তানিকারক দেশ ভারত ও ভিয়েতনাম আপাতত চাল রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বৈশ্বিকভাবে অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কায় চিন্তিত বিশেষজ্ঞরা। করোনাকালীন এই দুর্যোগে করোনার থেকেও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে ক্ষুধার কষ্ট; বিঘ্নিত হচ্ছে খাদ্য নিরাপত্তা। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে বাংলাদেশেও। আসন্ন ধস ঠেকিয়ে আমাদের দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখার অন্যতম মাধ্যম হলো কৃষি। ধেয়ে আসা ভয়াবহ খাদ্য সংকট থেকে কৃষিই পারে আমাদের বাঁচাতে।
আমাদের দেশের মূল খাদ্যশস্য ধান। সারা বছর যে পরিমাণ ধান উত্পাদিত হয়, তার অর্ধেক আসে বোরো মৌসুম থেকে। আর উত্পাদিত এই বোরো ধানের ২০ শতাংশ আসে হাওরাঞ্চল থেকে। দেশের দক্ষিণ-পূর্বের হাওরাঞ্চলের ধান কাটা শুরু হয়েছে। তবে লকডাউন অব্যাহত থাকার কারণে শ্রমিক সংকটের দরুন খেতের পাকা ধান নিয়ে দিশেহারা কৃষকরা। এদিকে আগাম বন্যার পূর্বাভাস তাদের শঙ্কা আরো বাড়িয়ে তুলেছে। দ্রুত ধান কেটে ঘরে তুলতে না পারলে যেকোনো সময় উজানের ঢল তলিয়ে দিতে পারে সোনার ফসল। শুধু হাওরাঞ্চলই নয়, দেশের সর্বত্রই এখন ধান পাকতে শুরু করবে। দক্ষিণ ও উত্তরাঞ্চলের শ্রমিকরা এই মৌসুমে ধান কাটা ও মাড়াইয়ের জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গিয়ে থাকেন। চলাচলে আরোপিত বিধি-নিষেধের কারণে তারাও গৃহে অবরুদ্ধ। শ্রমিক সংকটের কারণে ধান কাটার মজুরি বেড়ে যাওয়ায় উত্পাদন খরচও বেড়ে যাচ্ছে। খেতের ফসল খেতে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও করছেন অনেক কৃষক।
গত দুই বছর বোরো ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার ফলশ্রুতিতে এবার কৃষি মন্ত্রণালয়ের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় চার লাখ হেক্টর কম জমিতে বোরোর আবাদ হয়েছে বলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যে বেরিয়ে এসেছে। এই বছরও যদি কৃৃষকদের লোকসান গুণতে হয় তবে কৃষির ভবিষ্যত্ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না! সরকার ধান কাটা ও মাড়াইয়ের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। শ্রমিক সংকট নিরসনের জন্য প্রয়োজনীয় করোনা নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ সাপেক্ষে ধান কাটার শ্রমিকদের লকডাউন শিথিল করা যেতে পারে। ধান কাটা থেকে শুরু করে কৃষকের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করা পর্যন্ত সরকারকে প্রয়োজনীয় কৃষিবান্ধব উদ্যোগ নিতে হবে এবং বাস্তবায়নে আরো কঠোর হতে হবে।
এবার নজর দেওয়া যাক মৌসুমি শাকসবজির দিকে! আমরা দেখতে পাচ্ছি কৃষকরা তাদের উত্পাদিত শসা, টম্যাটো, করলা, ঢেঁড়সসহ নানাবিধ শাকসবজি নিয়ে পড়েছে বিরাট বিপাকে। এলাকার স্থানীয় বাজারে তারা তাদের পণ্যের ন্যায্যমূল্য তো পাচ্ছেই না, বরং যে মূল্য পাচ্ছে তা খুবই হতাশাজনক। খেয়ে বাঁচার আশাও ফুরিয়ে যাচ্ছে কৃষকদের, হচ্ছে সর্বস্বান্ত। তবে এসব পণ্যই শহরের বাজারগুলোতে বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। ফলাফল, কৃষক এবং ভোক্তা উভয়ই হতাশ!
এভাবে চলতে থাকলে কৃষিপণ্যের বিপণন ও লাভজনক দাম নিশ্চিত করতে না পারলে কৃষকরা কৃষিকাজের আগ্রহ হারাবে। ফসলের উত্পাদন না বাড়লে একসময় রাষ্ট্রীয় খাদ্য মজুত শূন্য হয়ে যাবে। ফলে সামনের দিনগুলোতে বিরাজমান পরিস্থিতি কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে দাঁড়াবে। দুর্ভিক্ষের কবলে জর্জরিত হবে গোটা জাতি। এরই মধ্যে কৃষি ও কৃষক বাঁচাতে সরকার যেসব পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে তা প্রশংসনীয়। এখন মাঠপর্যায়ে তা বাস্তবায়নের পালা। কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিশাল জনবল যারা গ্রাম, ওয়ার্ড, ইউনিয়ন পর্যন্ত বিস্তৃত, তাদেরকে প্রয়োজনীয় সাহায্য-সরঞ্জাম নিয়ে কৃষকের পাশে দাঁড়াতে হবে। তবে অবশ্যই নিজেদের করোনা নিরাপত্তার ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
আসন্ন দুর্ভিক্ষের ছোবল থেকে আমাদের বাঁচাতে যারা নিয়োজিত, যাদের কড়াপড়া হাতের ঘানিতে সচল হবে অবরুদ্ধ অর্থনীতির চাকা, দেশমাতার মুক্তিকামী সে সব সাধকের মুখে হাসি ফোটানোই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের ব্রত! মনে রাখতে হবে কৃষক বাঁচলে বাঁচবে কৃষি, কৃষি বাঁচলে বাঁচবে দেশ।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
