মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব

আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০২০, ২২:৪০

করোনা ভাইরাসের বিস্তার প্রতিরোধে কাজ করছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট এ দুই দপ্তরের মধ্যে স্বচ্ছতা ও সমন্বয়ের অভাব দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে তীব্র। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক শোনেন না মহাপরিচালকের কথা। আরেকজন পরিচালক নিম্নমানের সামগ্রী কেনাকাটায় ব্যস্ত। আবার মন্ত্রণালয়ের কোনো কোনো সিদ্ধান্তও জানানো হয় না মহাপরিচালককে। এভাবে সমন্বয়হীনতার কারণে করোনায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিত্সাসেবায় চরম অব্যবস্থাপনা বিরাজ করছে। একই সঙ্গে কোভিড-১৯ মোকাবিলায় অব্যবস্থাপনার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এখনো পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত রোগীদের সেবা দিচ্ছে চিকিত্সকদের জুনিয়র টিম। কোভিড-১৯ চিকিত্সার জন্য উচ্চতর বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের একটি টিম এখনো গঠিত হয়নি। চিকিত্সাসেবার ক্ষেত্রে নন-মেডিক্যাল পারসনদের মতামত এককভাবে বাস্তবায়িত হওয়ায় সৃষ্টি হয়েছে চরম অব্যবস্থাপনা। যার কাজ তাকে দিয়েই করানো উচিত।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দুজন শীর্ষ কর্মকর্তা এমন দুরবস্থার কথা স্বীকার করে বলেন, চিকিত্সাসেবায় ডাক্তার, নার্সসহ সব স্বাস্থ্যকর্মীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।     শুধু ডাক্তারদের নিরাপত্তার কথা ভাবলে হবে না। হাসপাতালের সুইপারদেরও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু সমপরিমাণ সুরক্ষাসামগ্রী না থাকায় বাস্তবিক অর্থে রোগীরা পড়ে থাকে। তেমন কোনো চিকিত্সাসেবা পান না। মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে সময় পেয়েও সুষ্ঠুভাবে কোনো কাজ সম্পন্ন হয়নি। এর মধ্যে আছে আবার রাজনৈতিক মতপার্থক্য। মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের একশ্রেণির কর্মকর্তা টেন্ডারবাজি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত। এ কারণে ডাক্তার-নার্সদের মধ্যে সরবরাহ করা হয়েছে নিম্নমানের মাস্ক ও পিপিই। কয়েকটি হাসপাতালের পরিচালকেরা জানান, বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে হাসপাতালের পরিচালক, মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ও সিভিল সার্জনদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক হওয়া উচিত। প্রতিদিন কোনো কোনো হাসপাতাল পরিচালক ৫ হাজার থেকে নিম্নে সহস্রাধিক রোগীর চিকিত্সাসেবার ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করছেন। তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো উচিত। এতে কার কার কী সমস্যা আছে তার তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব। কিন্তু কোনো বৈঠকই হচ্ছে না। কোভিড-১৯ চিকিত্সার জন্য ডেডিকেটেড রাজধানীর তিনটি হাসপাতাল—কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল ও মুগদা জেনারেল হাসপাতালে অব্যবস্থাপনার অন্ত নেই। এমন অবস্থার মধ্যে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের সমন্বয়ে তিনটি সাবকমিটি গঠন করা হয়েছে। আজ সোমবার থেকে এই তিন কমিটি রাজধানীর তিনটি হাসপাতালে পরিদর্শনে যাবে। স্বাধীনতা চিকিত্সক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি অধ্যাপক ডা. এম ইকবাল আর্সলানের নেতৃত্বে একটি কমিটি কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল পরিদর্শনে যাবে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. খান মো. আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে কমিটি মুগদা জেনারেল হাসপাতাল পরিদর্শনে যাবে। কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল পরিদর্শনে যাবে অধ্যাপক ডা. কাজী তারিকুল ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি। এই তিনটি টিম ঐ সব হাসপাতালে গিয়ে করোনা চিকিত্সাসেবায় কী কী অসুবিধা হচ্ছে, কী কী ঘাটতি আছে তা নিয়ে সরেজমিনে চিকিত্সক, নার্স ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলবেন। তারা হাসপাতাল পরিদর্শন করে সার্বিক বিষয়ে করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) পরিস্থিতি মোকাবিলায় ১৭ জন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের সমন্বয়ে গঠিত ‘জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটি’কে পরামর্শ দেবেন। ‘জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রোভিসি, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের নবজাতক বিভাগের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লা। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকেরা বলেন, এই কমিটি অনেক আগেই গঠন করা উচিত ছিল।

অভিযোগ আছে, করোনা ভাইরাস শনাক্তে কিট ও পারসোনাল প্রটেক্টিভ ইক্যুইপমেন্টের (পিপিই) মজুত নিয়ে সংকট বিরাজমান থাকার পরও মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা বারবারই বলেছেন, এসবের কোনো সংকট হবে না। পর্যাপ্ত মজুত আছে। তাই যদি হয়, তাহলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিরাময় কেন্দ্র ১৭ ফেব্রুয়ারি কেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে ১ লাখ পিপিই, ৫ লাখ মাস্ক, সার্জিক্যাল গগলস ও অন্যান্য সরঞ্জাম চেয়ে চাহিদাপত্র দিয়েছিল? অথচ এ বিষয়ে গড়িমসি করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান বলেছেন, ‘সব দেশের প্রতি আমাদের খুব সাধারণ একটি বার্তা, তা হলো পরীক্ষা, পরীক্ষা, পরীক্ষা। সব দেশেরই উচিত সন্দেহজনক সব রোগীকে পরীক্ষা করা। চোখ বন্ধ করে থাকলে দেশগুলো এই মহামারির সঙ্গে লড়াই করতে পারবে না। পরীক্ষা ছাড়া সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত করা যাবে না, সংক্রমণের শৃঙ্খল ভাঙা যাবে না। বিভিন্ন দেশই যে এই কাজে মারাত্মকভাবে পিছিয়ে আছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।’ বাংলাদেশে প্রতিদিন ১০ হাজার মানুষের পরীক্ষা করার ব্যবস্থা চালু করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, দেশে কোভিড-১৯ সংক্রমিত ব্যক্তিদের চিকিত্সার জন্য সারাদেশে ১২৬টি ভেন্টিলেটর প্রস্তুত রাখা হয়েছে। অথচ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা বরাবরই বলছেন, ৫০০ ভেন্টিলেটর রাখা হয়েছে। আরো ৩৫০টি ভেন্টিলেটর যুক্ত করা হবে। এ পরিস্থিতিকে ‘লেজে গোবরে অবস্থা’ আখ্যা দিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকেরা বলেন, সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮ অনুযায়ী এমন পরিস্থিতিতে ‘লিড’ দেবেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। দেশের কোন হাসপাতালে কী ধরনের সুবিধা আছে, আরো কী প্রয়োজন—এর পুরোটা জানেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও পরিচালকগণ। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের কোনো কোনো সিদ্ধান্ত মহাপরিচালক জানেনই না। ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তাকে জেনে নিতে হচ্ছে। এমন অবস্থার নিরসন হওয়া দরকার।