খাদ্যনিরাপত্তা ও বর্তমান বাস্তবতা

আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০২০, ২২:০৯

বাংলাদেশে খাদ্যশস্যের পর্যাপ্ত মজুত দেশের মানুষের খাদ্যের চাহিদা পূরণের নিশ্চয়তা দিলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে খাদ্য সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং খাদ্য কেনার সামর্থ্য থাকার বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মজুতকৃত খাদ্য দেশের মানুষের জন্য সরবরাহ করা হলেও অসাধু ব্যবসায়ী বা তত্সংশ্লিষ্ট কেউ যদি অন্যায়ভাবে তা মজুত রাখে এবং দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে তখন খাদ্যের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বিশিষ্ট নোবেল বিজয়ী বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন দুর্ভিক্ষের কারণ হিসেবে শুধু খাদ্যের কম উত্পাদনই নয় বরং পর্যাপ্ত খাদ্য মজুত থাকা সত্ত্বেও যদি সুষম বণ্টন না হয় তবুও দুর্ভিক্ষ হতে পারে বলে উল্লেখ করেছেন। তাই সংকটকালীন এ সময়ে দেশে মজুতকৃত খাদ্য সরবরাহের পর্যাপ্ততা, সুষম বণ্টন, স্বচ্ছতা এবং সহজেই পণ্য কেনার সামর্থ্যতার বিষয়গুলো নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করতে ইতিমধ্যে ৫০ লাখ দরিদ্র পরিবারের প্রায় আড়াই কোটি মানুষের জন্য রেশন কার্ডের ব্যবস্থা করেছেন যেন তাদের অন্যতম মৌলিক চাহিদা খাদ্যের সমস্যায় পড়তে না হয়। পাশাপাশি আরো ৫০ লাখ দরিদ্র পরিবারের জন্য জরুরি ভিত্তিতে রেশন কার্ড প্রস্তুতেরও নির্দেশনা দিয়েছেন। খাদ্যের মজুত বাড়াতে প্রায় ৬ লাখ টন বোরো ধান সংগ্রহের (২৬ এপ্রিল ২০২০ থেকে ৩১ আগস্ট ২০২০ পর্যন্ত) লক্ষ্যমাত্রা সামনে রেখে বোরো মৌসুমের কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। করোনা ভাইরাসের প্রভাবজনিত এই সংকটকালীন মুহূর্তে হোম কোয়ারেন্টাইন, লকডাউন ভেঙে ধান সংগ্রহ করার বিষয়টি সত্যিকার অর্থেই একটি বড়ো ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্যত সবার সার্বিক সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন। কারণ, আমরা জানি বোরো মৌসুমের এই ধান বর্তমান দুর্যোগ মোকাবিলায় এবং ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তাই তো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উদ্ভূত পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে ধান কাটা শ্রমিকদের মাঠে যাওয়া সহজীকরণ করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ প্রদান করা ছাড়াও কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরকে এই কাজে সহায়তা করার লক্ষ্যে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। বোরো ধান কাটার সময় কৃষকদের প্রযুক্তির ব্যবহার করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে। জমির আয়তন অনুযায়ী হারভেস্টার মেশিন ব্যবহার করে স্বল্পসংখ্যক কৃষক নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে ধান কাটতে পারেন। এই মেশিনের মাধ্যমে এক দিনে ৮-১০ একর জমির ধান কাটা, মাড়াই, ঝাড়াই ও বস্তায় সাজানো যায়। এতে প্রতি একরে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকার ডিজেল খরচ হয়। তাই, করোনাকালীন সময়ে শ্রমিকের স্বল্পতা ও করোনাঝুঁকি রোধে হারভেস্টার মেশিনের ভূমিকা অপরিসীম।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্য পরিস্থিতির পাশাপাশি খাদ্য পরিস্থিতিও ক্রমশ অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) প্রধান মহাপরিচালক টেড্রস অ্যাডহানম গ্রেব্রেইসুস যখন কোভিড-১৯কে সোয়াইন ফ্লুর চেয়েও ১০ গুণ শক্তিশালী ক্ষতিকর ভাইরাস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে প্রদেয় আর্থিক সহায়তা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। যা এই মুহূর্তে সমগ্র বিশ্বের মানুষের স্বাস্থ্যসেবার বিবেচনায় অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত ও হতাশাজনক একটি সিদ্ধান্ত। অন্যদিকে, বিশ্ব খাদ্য সংস্থার (এফএও) ডিরেক্টর অব ইমারজেন্সিস ডোমিনিক কার্জন বিশ্বের খাদ্যনিরাপত্তা প্রসঙ্গে বলেন, ‘পৃথিবীর কিছু স্থান দুর্ভিক্ষের খুব কাছাকাছি’। নিশ্চয় এ ধরনের ঘোষণা বিশ্বের খাদ্যনিরাপত্তার প্রসঙ্গকে চরম নাজুক অবস্থায় ফেলে দেয়। কেননা, খাদ্যের সংকট হলে মানুষ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে নয় বরং খাবারের অভাবে না খেয়েই মারা যাবে।

সমগ্র বিশ্বের খাদ্যের অনিশ্চয়তা আমাদের দেশের জন্যও সুখকর কোনো বিষয় নয়। যদিও বাংলাদেশ সরকার খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ অর্থনৈতিক গতিশীলতার জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। তথাপি সংকটকালীন এ সময়ে কৃষি কাঠামো সচল রাখতে শুধু কৃষকই নয় বরং খাদ্য উত্পাদনে সবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অংশগ্রহণের অনিবার্য প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে পৃথিবীর যত মানুষের এ অবধি মৃত্যু হয়েছে, সতর্ক হওয়া প্রয়োজন যেন এর চেয়ে অধিক মানুষ দুর্ভিক্ষে মৃত্যুবরণ না করে। করোনা ভাইরাস মানব সভ্যতার প্রতি যে চ্যালেঞ্জ ছুড়েছে তা মানব চর্চিত জ্ঞানের গভীরতা, বিচক্ষণতা, বিজ্ঞানের উত্কর্ষতা এবং মানব শ্রেষ্ঠত্বকে প্রকৃত অর্থেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

n লেখক :প্রভাষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ,

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা