২০১৩ সালেই মিলেছিল করোনা ভাইরাস!

আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০২০, ২২:৫৮

করোনা ভাইরাসের উত্স খুঁজতে মরিয়া হয়ে আছে বিশ্ববাসী। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন বারবারই চীনের ল্যাব থেকে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ করে আসছেন। অন্যদিকে বিজ্ঞানীরা অভিযোগ না করে বরং এর সঠিক উত্স খুঁজে বের করতে তাদের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ওপর জোর দিচ্ছেন। সাধারণত নতুন কোনো ভাইরাস পেলে সেটির বৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্য, জিনোম কোড ইত্যাদি লিপিবদ্ধ করে রাখার পাশাপাশি অন্য দেশে একই ধরনের গবেষণায় যুক্ত বিজ্ঞানীদের সঙ্গে তা শেয়ার করা হয়। করোনা ভাইরাসের জিন কোড যাচাই করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা দেখতে পেয়েছেন ২০১৩ সালেই এই ধরনের করোনা ভাইরাসের সন্ধান মিলেছিল চীনে। করোনা ভাইরাসের উত্স সম্পর্কে বেশির ভাগ বিজ্ঞানীর মত হচ্ছে, বাদুড়ই হচ্ছে করোনা ভাইরাসের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। বাদুড়ের শরীরের শত শত প্রজাতির করোনা ভাইরাস রয়েছে। সেই ধারণা থেকেই প্রায়ই বিজ্ঞানীরা বাদুড়ের ওপর গবেষণা করে থাকেন। এমনই একটি দল ২০১০ সালে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইউনান প্রদেশে বাদুড়ের গুহায় গিয়ে বিশেষ সতর্কতার সঙ্গে বাদুড়ের নমুনা সংগ্রহ করেন। নমুনা হিসেবে সংগ্রহ করার জন্য কিছু বাদুড়কে চেতনানাশক দিয়ে অজ্ঞান করে নিয়ে আসেন তারা। ইকো হেলথ অ্যালায়েন্সের ব্যানারে অন্যান্য বিজ্ঞানীদের নিয়ে গঠন করা দলের নেতৃত্ব দেন পিটার ডাসজাক। পিটার মূলত একজন ভাইরাস শিকারি। দেশে দেশে বাদুড়ের ওপর গবেষণা করে ভাইরাস খোঁজেন। সেই সঙ্গে যাতে কোনো ভাইরাস ভবিষ্যতের জন্য মহামারি ডেকে না আনতে পারে, সে বিষয়ে আগাম সতর্ক করার চেষ্টা করেন।

এই দলের অন্য একটি অংশ মিয়ানমার এবং কেনিয়া থেকেও বাদুড়ের নমুনা সংগ্রহ করেন। এই ধরনের কাজে থাকা বিজ্ঞানীদের একটি ওপেন সোর্স লাইব্রেরি থাকে; যারা প্রাণীদের ভাইরাস সম্পর্কে নিজের কাছে থাকা সব তথ্য এই লাইব্রেরির মাধ্যমে অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করেন। এই প্রক্রিয়ায় বিজ্ঞানীরা গবেষণায় একে অপরকে সাহায্য করার পাশাপাশি যে কোনো ধরনের মহামারি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করেন।

ডাসজাক বলেন, প্রায় ১৫ হাজার বাদুড়ের নমুনা থেকে ৫০০-র বেশি করোনা ভাইরাসের প্রজাতি সম্পর্কে তথ্য রয়েছে মানুষের হাতে। ২০১৩ সালে পাওয়া এমনই একটি করোনা ভাইরাসের সঙ্গে মিল পাওয়া গেছে কোভিড-১৯ এর। তবে ঐ ভাইরাসটির সঙ্গে শতভাগ মিল নেই কোভিড-১৯ অর্থাত্ সার্স-কোভ-২ ভাইরাসের।

সিঙ্গাপুরের ডুকে-নুসের ভাইরোলোজিস্ট ওয়াং লিনফা বলেন, ২০০৩ সালে সার্স করোনা ভাইরাস মহামারি আকার ধারণ করার আগে পর্যন্ত করোনা ভাইরাস সম্পর্কে মানুষের তেমন একটা কৌতূহল ছিল না। কিন্তু এরপরই করোনা ভাইরাস সম্পর্কে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে যেতে থাকে। গত এক যুগে করোনা ভাইরাস নিয়ে অনেক কাজ হয়েছে। ১৯৬০ সাল পর্যন্ত মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর মাত্র দুটি করোনা ভাইরাস সম্পর্কে জানত মানুষ। এর পর ২০০৯ সালে করোনা ভাইরাস নিয়ে বড়ো পরিসরে কাজ শুরু করে ইকোহেলথ অ্যালায়েন্স, স্মিথসোনিয়া ইনস্টিটিউশন, দ্য ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াকেন্দ্রিক একটি প্রতিষ্ঠান মেটাবায়োটা।

স্মিথসোনিয়া ইনস্টিটিউশনের নেতৃত্বে থাকা সুজান মুরি বলেন, যিনি মিয়ানমার এবং কেনিয়াতে বাদুড়ের ওপর গবেষণা করেছেন; তিনি বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত ৬টি নভেল করোনা ভাইরাস শনাক্ত করতে সমর্থ হয়েছি। মূলত যে অঞ্চলগুলোতে বাদুড়ের বিস্তার বেশি এবং অন্যান্য প্রাণির মধ্যস্থতায় মানুষের সংস্পর্শে আসার সুযোগ বেশি রয়েছে, সেখানেই আমরা নজর দিয়েছিলাম।

চীনের যে অঞ্চলটিকে তারা বাদুড়ের ওপর গবেষণার জন্য বেছে নিয়েছিলেন, সেখানকার মানুষের ওপর গবেষণা করে তারা দেখতে পেয়েছেন যে, শতকরা ৩ ভাগ মানুষের মধ্যেই সেসব নভেল করোনা ভাইরাসের অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছিল। তখনই তারা নিশ্চিত হন যে, কোনো না কোনোভাবে বাদুড়ের এসব করোনা ভাইরাস মানুষে সংক্রমিত হয়েছে বলেই তাদের শরীরে অ্যান্টিবড়ি তৈরির ঘটনা ঘটেছে। বাদুড়ের সঙ্গে সেখানকার মানুষের গভীর সংশ্রব রয়েছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, সরাসরি বাদুড়ের থেকে করোনা ভাইরাস গিয়েছিল বলে সেগুলো তেমন বেশি ক্ষতকর ছিল না। কিন্তু যদি মধ্যবর্তী কোনো প্রাণীর মাধ্যমে করোনা ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করে, তাহলে তা ভয়াবহ রূপ লাভ করতে পারে। এই যেমন বনবিড়াল, বিড়াল, প্যাঙ্গোলিন, উট কিংবা অন্য কোনো স্তন্যপায়ী প্রাণী।

ওপেন সোর্স লাইব্রেরিতে তথ্য যাচাই করতে গিয়ে কোভিড-১৯ রোগের জন্য দায়ী করোনা ভাইরাস সার্স-কোভ-২ এর পরিচয় খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। চীনের ভাইরোলোজিস্ট শি ঝেংলি কোভিড-১৯ জিন কোড পাওয়ার পর সেটিকে পরীক্ষার জন্য সেই ওপেন সোর্স লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত করোনা ভাইরাসের নমুনার সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে জানতে পারেন, ২০১৩ সালেই ইকোহেলথ অ্যালায়েন্সের বিজ্ঞানীরাই সেটিকে চিহ্নিত করেছিলেন। সার্স-কোভ-২ এর সঙ্গে ইকোহেলথ অ্যালায়েন্সের খুঁজে পাওয়া ভাইরাসটির জিনগত ৯৬.২ শতাংশ মিল রয়েছে। যার মানে হচ্ছে সেটি হয়তো নভেল করোনা ভাইরাসের পূর্বসূরি ভাইরাস ছিল। ওই ভাইরাসটির ৩.৮ শতাংশ অমিল থাকার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা বলেন, হয়তো যে প্রাণীর মাধ্যম হয়ে এটি মানুষের শরীরে প্রবেশ করেছে তার কার কারণেই এই ৩.৮ শতাংশ জিনোম বদলে যেতে পারে। এ কারণে এখন বিজ্ঞানীরা ওই সময়ে যে বাদুড় থেকে এই করোনা ভাইরাস সংগ্রহ করেছিলেন, তার সম্পর্কে জানার চেষ্টা করছেন। যাতে বুঝতে পারেন কীভাবে এটি সেই বাদুড় থেকে মানুষের শরীরে এলো, কিংবা ভবিষ্যতে এই ধরনের দুর্যোগ আগেভাগে মোকাবিলা করা যায়। গত বছর জানুয়ারিতে কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির একদল বিজ্ঞানী আফ্রিকায় ইবোলার জন্য দায়ী বাদুড়ের প্রজাতিকে খুঁজে বের করেছিল। পিটার ডাসজাক বলেন, আশাকরি আমরা খুব দ্রুত দায়ী বাদুড়কে খুঁজে বের করতে পারব এবং জানতে পারব যে, আসলে কীভাবে কোভিড-১৯ রোগ মানুষকে আক্রান্ত করল।—সিএনএন