প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের আতঙ্কে খুলনায় বোরো ধান কাটতে কৃষিশ্রমিকের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে যে সামান্য শ্রমিক মিলছে তার জন্যও কৃষকদের গুনতে হচ্ছে অধিক পারিশ্রমিক। তারপরও কৃষক অতিকষ্টে ধান কাটতে পারলেও ঘরে তুলতে পারছে না। তৈরি হয়েছে নতুন সংকট। রোদে শুকানোর জন্য কেটে রাখা ধান বৃষ্টির কারণে এখন মাঠেই নষ্ট হতে বসেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, খুলনা অঞ্চলের মাঠে কৃষকের স্বপ্নের সোনালি বোরো ধান কাটার উত্সব চলছে। কিন্তু করোনা সংক্রমণ রোধে গৃহবন্দি থাকায় দেখা দিয়েছে কৃষিশ্রমিক সংকট। তার মধ্যে বাদ সেধেছে বৈশাখের বৈরি আবহাওয়া। কৃষক বোরো ধান কেটে কিছুটা রস টানার (শুকানো) জন্য মাঠেই রেখে দেন সেই কাটা ধান। অধিকাংশ কৃষকই ধান ঘরে তুলতে পারেননি। কিন্তু এরই মধ্যে গত চার-পাঁচ দিনের প্রবল বর্ষণে জমিতে পানি জমে যাওয়ায় ধানও ভাসতে শুরু করেছে। এতে কাঁদা মিশে ধান ঝরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গরুর খাবার হিসেবে ব্যবহূত বিছালিও (খঁড়-কুটো) পঁচতে শুরু করেছে।
এদিকে অতিবর্ষণে খুলনার শস্যভাণ্ডার বলে খ্যাত ডুমুরিয়া উপজেলার বেশিরভাগ জমিতে পানি জমে গেছে। এতে এ উপজেলার অধিকাংশ কৃষকই ক্ষতির আশঙ্কা করছেন। বিশেষ করে এ উপজেলার সিংগাইর (সিঙ্গের বিল), বানিয়াখালি বিল, খলশির বিল, বামনদিয়ার বিল ও গোনালির বিলসহ অধিকাংশ বিলই পানিতে থৈ থৈ করছে। বৃষ্টির এ পানিতে কৃষকের স্বপ্নও ভাসছে।
উপজেলার টিপনা গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক মো. জামাল গাজী জানান, ৩৫ হাজার টাকা ব্যয়ে অনেক স্বপ্ন নিয়ে ১ একর ২০ শতক জমিতে বোরো ধান লাগিয়ে ছিলাম। ফলনও হয়েছিল ভালো। গত বৃহস্পতিবার ৮-১০ জন শ্রমিক নিয়ে পুরো জমির ধান কেটে জমিতে রেখে দেই। দুই দিন রোদ পেলে একটু রস টেনে যেত; ধান বাড়িতে নিয়ে যেতাম। কিন্তু অতিরিক্ত বৃষ্টিতে গাছসহ ধান ভেসে উঠেছে। এতে ধান ও বিছালি নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। দুই-এক দিনের মধ্যে তুলতে না পারলে এ ধান আর গোলায় উঠানো সম্ভব হবে না।
একই গ্রামের কৃষক মো. সজ্জেদ ফকির ও মো. খানজাহান আলী বলেন, যেখানে শ্রমিকের মূল্য ছিল জনপ্রতি ৫০০ টাকা। সেখানে এখন ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা করে শ্রমিক দিয়ে ধান কেটেছি। কিন্তু বৃষ্টির কারণে ধান ঘরে তুলতে না পারায় এখন বিক্রি করা তো দূরের কথা, সারা বছরের খাবারেরও সংকট দেখা দেবে।
একইভাবে সিঙ্গাইর বিলের কৃষক আব্দুল আজিজ মোল্লার ১২ বিঘা, নূরুল ইসলামের সাড়ে ৩ বিঘা, কামরুল ইসলাম সরদারের ৫ বিঘা, জিয়াউর হালদারের ৪ বিঘা, সাইদুল গাজীর দেড় বিঘা, শাহাজান ফকিরের ৬ বিঘা ও আব্দুর রাজ্জাক সরদারের ১ বিঘা ও খলশির বিলের লাভলু শেখের জমির ধানও পানিতে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ডুমুরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, ডুমুরিয়া উপজেলায় বোরো আবাদ হয়েছে ২১ হাজার ২০৫ হেক্টর জমিতে। উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ২৭ হাজার ২৩০ মেট্রিকটন। তবে বৈরি আবহাওয়ার কারণে ক্ষতির আশঙ্কায় রয়েছেন কৃষকরা।
খুলনা কৃষি অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক পংকজ কান্তি মজুমদার বলেন, খুলনায় ৫৭ হাজার ৫৪০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। ২ লাখ ৫০ হাজার টন ধান উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। গত বছর ৫৯ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো উত্পাদন হয়েছিল।
