প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘অনেক সময় দেখি বিত্তশালীরা শুধু হা-হুতাশ করে বেড়ায়। তাদের মধ্যে নাই নাই অভ্যাসটাই যায় না; ঐ চাই চাই ভাবটাই যেন সবসময় থেকে যায়।’ গতকাল সোমবার সকালে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধ ও সংকট মোকাবিলায় তার সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে রাজশাহী বিভাগের আট জেলার কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে মতবিনিময়কালে তিনি এ কথা বলেন।
শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ রোধে ঘরবন্দি কর্মহীন মানুষের খাদ্য সহায়তার জন্য উপজেলা প্রশাসনের তহবিলে ১০ হাজার টাকা দান করা ভিক্ষুক নাজিমুদ্দিনের মহানুভবতার প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তার কাছ থেকেও শেখার আছে অনেক কিছু। এই ঘটনা বিশ্বে উদারতার এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করল।’ সমাজের স্বচ্ছল ও বিত্তবানদের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী কিছুটা আক্ষেপ করে বলেন, ‘আসলে উনি (ভিক্ষুক নাজিমুদ্দিন) যে উদারতাটা দেখিয়েছেন, বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে কিন্তু এই মানবিক বোধটা এখনো আছেই; কিন্তু সেটা আমরা পাই শুধু নিঃস্বদের কাছেই।’
প্রধানমন্ত্রী বর্তমান করোনা পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, ‘আমরা এখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলব না। বর্তমান করোনা পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অন্তত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্কুল-কলেজসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। করোনা মহামারি যখন থামবে তখন আমরা খুলব।’
প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সে বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, নওগাঁ, নাটোর, পাবনা, রাজশাহী এবং সিরাজগঞ্জ জেলার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। ভিডিও কনফারেন্সে জেলা প্রশাসক, জনপ্রতিনিধি, পুলিশ, র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, সিভিল সার্জন, চিকিত্সক, নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিনিধি, মসজিদের ইমাম, শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশাজীবীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মতবিনিময় করেন। স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিবের নেতৃত্বে মহাখালীস্থ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগ-দপ্তর এবং আইইডিসিআরও ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত ছিল। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন। পিএমও সচিব তোফাজ্জেল হোসেনসহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ গণভবন প্রান্তে উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সারা দেশের প্রতিটি জেলায় আইসিইউ (ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট) স্থাপন করা হবে। প্রত্যেক জেলার ভালো একটা হাসপাতালে আমরা আইসিইউ স্থাপন করব। সরকার শিগগিরই ২ হাজার চিকিত্সক এবং ৬ হাজার নার্স নিয়োগ দেবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নতুন ডাক্তার ও নার্সদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রশিক্ষণ শেষে তারা সেবা দেবেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘যারা ইতিমধ্যে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করেছেন, কিন্তু করোনা ভাইরাসের কারণে এই কমাস সবকিছু বন্ধ থাকায় ঋণের সুদ হয়ে গেছে, সেটার জন্য আপনারা চিন্তা করবেন না। এই সুদ যেন স্থগিত থাকে এবং পরবর্তীকালে কতটুকু মওকুফ করা যায় এবং কতটুকু আপনারা নিয়মিত দিতে পারেন, সেটা বিবেচনা করা হবে।’ করোনা ভাইরাস পরবর্তী ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনায় তার সরকারঘোষিত প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার প্রণোদনার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের মত্স্যচাষি থেকে শুরু করে, পোলট্রি, ডেইরি বা যারা কৃষিকাজ ও বিভিন্ন ধরনের ছোটোখাটো ব্যবসা করেন তাদের প্রত্যেকের কথা চিন্তা করে এবং অন্যান্য দিকে খেয়াল রেখেই এই ১ লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। যেখান থেকে মাত্র ২ শতাংশ সুদে টাকা দেওয়া হবে, যাতে তারা তাদের ব্যবসা চালু রাখতে পারেন।’
শেখ হাসিনা বলেন, মানুষের কাজ নেই। বিশেষ করে একেবারে নিম্ন আয়ের লোক, এমনকি ছোটোখাটো কাজ করে যারা খায়, তাদের কষ্ট আমরা জানি। তার সরকারের সামাজিক নিরাপত্তাবলয়ের ৫০ লাখ সুবিধাভোগীর সঙ্গে আরো ৫০ লাখ যোগ করার জন্য রেশনকার্ড প্রদানের তালিকা প্রণয়নকালে যাদের প্রয়োজন তারা যেন কেউ বাদ না পড়ে তা নিশ্চিত করতে তার নির্দেশের কথাও পুনরোল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘ভিজিডি, ভিজিএফ এবং সামাজিক নিরাপত্তাবলয়ের কর্মসূচির বাইরে যারা রয়েছেন, যারা করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কিন্তু হাত পেতে চাইতে পারছেন না, তাদের প্রকৃত তালিকা করার জন্য আমি আমার দলের নেতা-কর্মীসহ প্রশাসনের সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিচ্ছি।’ তিনি বলেন, আমাদের সবচেয়ে বড়ো কাজ হলো মানুষকে বাঁচিয়ে রাখা। আর আমাদের জীবন-জীবিকার পথটা উন্মুক্ত রাখা। রমজানের মাঝামাঝি সময়ে পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখেও সরকারের পক্ষ থেকে আরো সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাস প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সবাইকে রমজানের মোবারকবাদ জানিয়ে আমি এটুকুই বলব, সবাই আল্লাহর দরবারে কায়মনোবাক্যে দোয়া করেন— করোনা ভাইরাস থেকে বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বের মানুষ যাতে মুক্তি পায়।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি যে এই দুঃসময় থাকবে না, এটি আমরা কাটিয়ে উঠব। আমাদের কলকারখানাসহ সবই আবার চালু হবে এবং দেশের অর্থনীতি আবার সচল হয়ে উঠবে। আমাদের আলোর পথের যাত্রা আবারও শুরু হবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে করোনাপরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইড লাইন অনুসরণ করে ৩ হাজার ৪৬৪ জন চিকিত্সক অনলাইনে চিকিত্সা সেবা দিয়ে যাচ্ছে। তিনি পাবনার সঙ্গে মতবিনিময়কালে রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পে কর্মরত, যারা বিদেশ থেকে কাজে যোগ দিতে আসবেন, তাদের কাজে যোগদানের আগে দুই সপ্তাহের কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করার জন্যও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতি নির্দেশ দেন।
