বৈশ্বিক মহামারি করোনায় আজ বিপর্যস্ত গোটা দেশ। করোনার প্রাদুর্ভাবে দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের জীবনযাত্রা অনেকটাই থমকে গেছে। রাস্তার পাশে টঙ দোকানে চা-বিক্রেতা, রিকশাচালক কিংবা পরিবহন শ্রমিক নিম্ন আয়ের সব পেশার মানুষই এখন অর্থকষ্টে ভুগছেন। আয়ের একমাত্র পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন অনেকে। সংসারের খরচ চালাতে অনেককেই তাই চেয়ে থাকতে হচ্ছে অন্যের মুখের দিকে কিংবা ত্রাণের জন্য। তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার প্রধান সড়কের পাশে অনেক নারীকে দেখা যায় ত্রাণের জন্য অপেক্ষা করতে।
এমনই একজন আঙ্গুরি বেগম। শারীরিক প্রতিবন্ধী স্বামী আর মেয়েকে নিয়ে কোনো রকমে চলছিল জীবন। কিন্তু করোনার কারণে লকডাউন শুরু হওয়ার পর থেকে দারুণ বিপাকে পড়েছেন আঙ্গুরি বেগম। জীবনের দীর্ঘসময় বসবাস করছেন রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার বেগুনবাড়িতে। স্বামী এক সময় রিকশা চালাতেন। তাতেই সংসার চলতো। কিন্তু দুর্ঘটনায় স্বামী মারাত্মক আহত হলে নিজেই সংসারের হাল ধরেন। তেজগাঁও এলাকায় ফুটপাতে চা বিক্রি করে সংসার চালাতেন। করোনা ভাইরাসের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে তার সেই চায়ের দোকান। চরম অভাবের মধ্যে দিয়ে দিনাতিপাত করছেন। এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, জীবনে অনেক কষ্ট করেছি। কষ্টের মধ্যেও সুখের ঘাটতি ছিল না। কিন্তু করোনা আমার সে সুখ কেড়ে নিয়েছে। অভাব থাকলেও কোনোদিন কারো কাছে হাত পাতিনি। কিন্তু করোনার কারণে এখন চেয়ে থাকি কে কখন সাহায্য দেবে। যে যখন যা দিচ্ছে হাত পেতে নিচ্ছি। শুধু আঙ্গুরী বেগমই নয়। তেজগাঁও জাতীয় নাক কান গলা ইনস্টিটিউটের (হাসপাতাল) সামনে আঙ্গুরিসহ আরো ক’জন নারী চায়ের দোকান চালাতেন তাদের সবারই একই অবস্থা।
তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় বিভিন্ন বস্তিতে সব মিলিয়ে কয়েক হাজার রিকশাচালকের বসবাস। লকডাউন শুরু হওয়ার পর শিল্পাঞ্চল থানা পুলিশ রিকশার গ্যারেজ বন্ধ করে দিয়েছে। এছাড়া গলিপথের মুখে রিকশা দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করে দিয়েছে। ফলে লুকিয়ে কেউ রিকশা নিয়ে বের হবে এমনও সুযোগ নেই। তাদের সবারই অবস্থা বড়ো করুণ।
গতকাল দুপুরে বেগুনবাড়ি এলাকায় কথা হয় রিকশাচালক আবুল কালামের সঙ্গে। তিনি প্রায় ১৫ দিন পর রিকশা নিয়ে বের হয়েছেন। যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তিনি বলেন, মানুষ কতদিন আর বাড়ি থাকবো? পেটে ভাত না থাকলে, কিসের লকডাউন? এ আইন মাইনা আমাগো পেটে কি ভাত আইবো?’
রিকশাচালক কালামের মতোই খেটে খাওয়া নিম্নবিত্ত থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত মানুষও এখন সীমিত আকারে লকডাউন শিথিলের দাবি জানাচ্ছেন। গত এক মাস সবকিছু বন্ধ থাকায় জমানো টাকায় হাত পড়তে শুরু করেছে মধ্যবিত্তদের। আর যারা স্বল্প পুঁজির ব্যবসা করতেন, তাদেরও মাথায় হাত।
লকডাউনের কারণে গত একমাস ধরে বাস চলাচল বন্ধ। ফুলবাড়িয়া টার্মিনালে পার্কিং করা কয়েকশ বাসেই জীবন কাটাচ্ছে কয়েকশ পরিবহন শ্রমিক। মূলত এসব শ্রমিকরা বাস পাহারার দায়িত্ব পালন করছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন পরিবহন শ্রমিক মোবাইল ফোনে বলেন, অনেক পরিবহন শ্রমিকদের ঢাকায় থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে বাসের মধ্যেই তাদের জীবনযাপন করতে হচ্ছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় একজন শ্রমিক নেতা ছাড়া কেউ তাদের কোনো ধরনের খোঁজখবর নিচ্ছেন না।
এ ব্যাপারে ঢাকা জেলা যানবাহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ও যুবলীগ (ঢাকা দক্ষিণ) সহ-সম্পাদক মো. শহিদুল্লাহ শাহিন পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের ব্যাপারে কোনো মন্তব্য না করে বলেন, ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনালে আটকেপড়া পরিবহন শ্রমিকদের সাধ্যমতো যা পারছি (ত্রাণ) সাহায্য করে যাচ্ছি। যতদিন লকডাউন থাকে ততোদিন এ সাহায্য অব্যাহত রাখার চেষ্টা করে যাব।
