৭০ বছর পুরান ঢাকার কোট-কাচারি এলাকায় কেটেছে প্রবীণ ক্রীড়া সাংবাদিক কামরুজ্জামানের। এই দীর্ঘ সময়ে মুক্তিযুদ্ধসহ অনেক চরাই-উতরাই পার করেন এই এলাকায়। কিন্তু এ বছরের মতো রোজা আসেনি তার জীবনে। বলেন, ছেলেবেলা থেকে রোজা রাখি। রোজার দিনে দুপুর থেকেই স্থায়ী অস্থায়ী দোকানি মুখরোচক নানা পদের ইফতার সামগ্রীর পসরা সাজিয়ে বসতেন। বাড়ির চারপাশের রাস্তায় মৌসুমি ইফতার বিক্রেতাদের হাঁকডাকে মুখরিত থাকত। পুরান ঢাকার মানুষতো বটে নতুন ঢাকার মানুষও আসত সেখানে ইফতার নিতে। চকবাজারের ইফতার তো বলতে গেলে বিশ্ব বিখ্যাত। রোজার দিনে চকবাজারসহ পুরান ঢাকার রাস্তাঘাটগুলোতে ইফতার কিনতে মানুষের ভিড় লেগে যেত। কিন্তু এ বছর সেখানে একদম ভিন্ন চিত্র। পুরান ঢাকার সব অলিগলি এখন শুনসান। নেই ‘হেই গরম গরম জিলাপি, হালিম’—এমন হাঁকডাক। সবই যেন ঠান্ডা করে দিয়েছে করোনা। বাসাতেই মুসল্লিরা তারাবির নামাজ পড়ছেন। বাড়িতে আছেন সবাই, ইফতার করছেন কিন্তু যেন কোনো আনন্দ নেই। মৌসুমী ইফতার বিক্রেতাদেরও এবার আর ব্যবসা করা হলো না। তারা অনেকেই চরম অর্থকষ্টে খেয়ে না খেয়ে আছেন।
এভারেস্ট বিজয়ী এম এ মুহিত বড়ো হয়েছেন পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার আর ইসলামপুরে। তিনিও আগে কোনোদিন এবারের মতো রোজা দেখেননি বলে জানান। বলেন, আগে রোজার সময় ইফতার বাজার ও ইসলামপুরের পাইকারি কাপড়ের মার্কেটে ঈদ কেনাকাটায় আসা মানুষের ভিড় অসহনীয় লাগত। রোজার দিনে জ্যামের কারণে রাস্তায় চলাচলেও বিরক্তি আসত। তবে এমন ‘মৃত্যুপুরির’ মতো রোজার পরিবেশও কাম্য নয়। বলেন, ছোটোরা বেশি মিস করছে রোজার স্বাভাবিক পরিবেশ। গৃহিণী সানজিদা বলেন, আগে রোজায় সেহরি খাওয়ার মধ্যে কত আনন্দ ছিল। এবার যেন সেই আনন্দটা আর পাই না।
নবাব বাড়ির বাসিন্দা এস কে এম আকবর বলেন, আমরা ঢাকাইয়ারা চাঁদ দেখা থেকে অন্য এক আনন্দ নিয়ে রোজা উদ্যাপন শুরু করি। চকবাজারের ইফতার, আল রাজ্জাকের কাবাব, ডিসেন্টের হালিম, শাহী টুকরা, দই বড়া এক এক দিন এক এক জায়গা থেকে বিশেষ ইফতার এনে বাড়িতে সবাই মিলে মজা করে খেতাম। কিন্তু এ বছর আর তা হচ্ছে না, আল্লাহ আল্লাহ করে পরিবার নিয়ে যেন নিরাপদে থাকতে পারি, সেই দোয়াই করছি।
পুরান ঢাকার অন্যতম জনপ্রিয় দোকান সাতরওজার আনন্দ বেকারির ব্যবস্থাপক দুলাল কুমার গুপ্ত ইত্তেফাককে বলেন, রমজানে শাহী পরোটা, কিমা পরোটা, আস্ত মুরগী মোসাল্লাম, শাহী আর রেশমী জিলেপি, লাবাং, শাহী হালিম, জাফরান সরবত, শাহী কাবাব, জালি কাবাব, সুতি কাবাব প্রভৃতি আইটেমের ব্যাপক চাহিদা থাকে। ইফতারের আগে দুপুর থেকেই ক্রেতা সামলাতে আমরা হিমশিম খাই। কিন্তু এবার পরিস্থিতি অন্যরকম।
কোতোয়ালি রোড জামে মসজিদের তারাবির নামাজ পড়ান বড়ো হুজুর খ্যাত মাওলানা বদরুল হুদা। তিনি বলেন, দোয়া করি আল্লাহ যেন আমাদের করোনা মহামারি থেকে মুক্তি দেন, শিগিগরই আমরা যেন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে পারি।
