অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী আর নেই

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০২০, ২২:৫০

বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রধানতম কারিগর ছিলেন তিনি। দেশে গত কয়েক দশকে যত বড়ো ভৌত অবকাঠামো হয়েছে, তার প্রতিটিতেই ছিল তার অবদান। শিক্ষক, প্রকৌশলী, নীতিনির্ধারক, গবেষক এই ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী আর নেই। গতকাল সোমবার গভীর রাতে তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি...রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর। তিনি স্ত্রী সেলিনা নওরোজ চৌধুরী, মেয়ে কারিশমা ফারহিন চৌধুরী ও ছেলে কাশিফ রেজা চৌধুরীসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

জাতীয় অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর জানাজা গতকাল মঙ্গলবার বাদ জোহর ধানমন্ডি ঈদগা মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। এতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। তার পরেও তার অসংখ্য গুণগ্রাহী জানাজায় অংশ নেন। জানাজা শেষে বনানী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

শিক্ষকতা, অবকাঠামো উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি খাত এবং রাষ্ট্রের ক্রান্তিকালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তার অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে রইবে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করা এই পুরকৌশলী যুক্ত ছিলেন দেশের প্রথম মেগা প্রকল্প বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণে বিশেষজ্ঞ প্যানেলের চেয়ারম্যান হিসেবে। আর এখন পদ্মার ওপরে দেশের সবচেয়ে বড়ো যে সেতু তৈরি হচ্ছে, সেই প্রকল্পের আন্তর্জাতিক      পরামর্শক প্যানেলেরও নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন তিনি। এছাড়াও, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, কর্ণফুলী টানেলসহ চলমান নানা উন্নয়ন প্রকল্পেও বিশেষজ্ঞ প্যানেলের নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন তিনি। ১৯৯৩ সালে যাদের হাত দিয়ে বাংলাদেশের ইমারত বিধি তৈরি হয়েছিল, জামিলুর রেজা চৌধুরী তাদেরই একজন।

গত রাতে ধানমন্ডির বাসায় জামিলুর রেজা চৌধুরী ঘুমিয়ে ছিলেন। ভোরে সেহরির সময় তার স্ত্রী তাকে ডাক দেন। কোনো সাড়া না পাওয়ায় তাকে দ্রুত স্কয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিত্সক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিত্সকরা জানান, হাসপাতালে আনার আগেই তিনি মারা গেছেন। জামিলুর রেজা চৌধুরীর জামাতা অধ্যাপক জিয়া ওয়াদুদ মঙ্গলবার ভোরে ফেসবুকে তার মৃত্যুর খবর জানান। তার ভাগেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস ফ্যাকাল্টির ডিন অধ্যাপক শিবলী রুবায়েত-উল-ইসলাম জানান, ‘সোমবার রাত ২টার দিকে ঘুমের মধ্যে অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর ‘ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক’ হয়। ভোর ৪টার দিকে খালুকে নিয়ে যখন স্কয়ার হাসপাতালে নিয়ে যাই, ততক্ষণে তিনি আর নেই, সব শেষ।’

তার মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইমরান আহমেদ, রেলমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন, বিএনপি মহাসচিব মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন, জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি প্রমুখ।

এছাড়াও শোক প্রকাশ করে বাণী দিয়েছেন ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া, চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী, সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের সংগঠন ন্যাশনাল লইয়ার্স কাউন্সিল।

অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী ছিলেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য। পরবর্তীকালে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের উপাচার্য। জামিলুর রেজা চৌধুরী একসময় যুক্তরাষ্ট্রে কাজের ডাক পেয়েছিলেন বিখ্যাত আরেক বাংলাদেশি প্রকৌশলী এফ আর খানের কাছ থেকে। একুশে পদক পাওয়া এই শিক্ষককে ২০১৮ সালে সরকার জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে সম্মানিত করে। এর বাইরেও অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন সফটওয়্যার রপ্তানি এবং আইটি অবকাঠামো টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান ছিলেন ১৯৯৭ সাল থেকে পরবর্তী পাঁচ বছর। ১৯৯৯ সালে তথ্যপ্রযুক্তি নীতিমালা করার জন্য যে কমিটি করা হয়েছিল, জামিলুর রেজা চৌধুরীকেই তার আহ্বায়ক করা হয়। ২০০১ সালে তাকে প্রধানমন্ত্রীর আইটি টাস্কফোর্সেরও সদস্য করা হয়।

পুরকৌশলের এই শিক্ষক নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংকের পরিচালক পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৬ সালে বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দেখভাল করেছেন।

যুক্তরাজ্যের ইনস্টিটিউশন অব সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্সের ফেলো জামিলুর রেজা চৌধুরী নব্বুইয়ের দশকের শুরুতে ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশের সভাপতি ছিলেন। বাংলাদেশ কম্পিউটার সোসাইটিতেও তিনি ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশ আর্থকোয়েক সোসাইটিসহ বিভিন্ন সংগঠন এবং বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডসহ নানা আয়োজনে জামিলুর রেজা চৌধুরী ছিলেন নেতৃত্বের ভূমিকায়। বহুতল ভবন নির্মাণ, স্বল্প খরচে আবাসন, ভূমিকম্প সহনীয় ভবন নকশা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে ইমারত রক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং প্রকৌশল নীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় ৭০টি গবেষণা প্রবন্ধ রয়েছে তার।

কাজের স্বীকৃতি হিসেবে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন জামিলুর রেজা চৌধুরী। একুশে পদক ছাড়াও জাপান সরকার জামিলুর রেজা চৌধুরীকে সম্মানজনক ‘অর্ডার অব দ্য রাইজিং সান, গোল্ড রেইস উইথ নেক রিবন’ খেতাবে ভূষিত করে। ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টর অব ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি পাওয়া একমাত্র বাংলাদেশি তিনি।

অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী ১৯৪৩ সালের ১৫ নভেম্বর সিলেট শহরে প্রকৌশলী আবিদ রেজা চৌধুরী ও হায়াতুন নেছা চৌধুরীর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিন ভাই দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। প্রাথমিক শেষ করে ময়মনসিংহ জেলা স্কুলে ভর্তি হলেও পরে তার পরিবার ঢাকায় চলে আসে। প্রথমে নবাবপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও পরে সেন্ট গ্রেগরিজ হাই স্কুল থেকে ১৯৫৭ সালে তিনি ম্যাট্রিক পাশ করেন। ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৫৯ সালে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে ভর্তি হন তত্কালীন আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে (বর্তমান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়)। ১৯৬৩ সালে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক শেষ করে সেখানেই শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৬৮ সালে যুক্তরাজ্যের সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাডভান্স স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতকোত্তর করেন। সেখানেই পিএইচডি করেন ‘শিয়ার ওয়াল অ্যান্ড স্ট্রাকচারাল অ্যানালাইসিস অব হাইরাইজ বিল্ডিং’ বিষয়ে।

জাতীয় পার্টি-জেপির শোক

জাতীয় অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর আকস্মিক ইন্তেকালে গভীর শোক  ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলাম। শোকবার্তায় তারা অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীকে দেশের প্রকৌশল ও কারিগরি জগতের একজন দিকপাল হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, তার মৃত্যুতে যে শূন্যতার সৃষ্টি হলো তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। তিনি একাধারে ছিলেন সেরা প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ, শিক্ষাবিদ এবং আমাদের স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণে যে বিশেষজ্ঞ টিম রয়েছে তার প্রধান। তার মৃত্যুতে নেতৃদ্বয় মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা ও শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানান।