ডা. হাসনাইন নান্না
পৃথিবীর দেশে দেশে চিকিত্সক ও বিশেষজ্ঞরা করোনা মোকাবিলায় গুরুত্ব দিচ্ছেন একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে। একে সাধারণভাবে বলা হচ্ছে সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং। বাংলায় সামাজিক দূরত্ব। কিন্তু সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং বা সামাজিক দূরত্ব অনেক নির্দয় ও নিষ্ঠুর। এমনকি অসামাজিক প্রস্তাবও বটে। একটু খেয়াল করলেই বোঝা যাবে, প্রবক্তারা মানুষের সঙ্গে মানুষের সামাজিক ও মানসিক দূরত্ব বাড়ানোর কথা মোটেই বোঝাচ্ছেন না। তারা কেবল পরিবারের ভেতরে, পাড়া-মহল্লা কিংবা জাতীয় জীবনে ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির শারীরিক দূরত্ব বজায়ের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। তারা মেপে মেপে একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখা, করমর্দন ও কোলাকুলি পরিহার করা ইত্যাদির ওপর জোর দিচ্ছেন। কিন্তু ‘সামাজিক দূরত্ব’ কথাটার বিপরীত প্রভাব পড়ছে যেন জনজীবনে।
‘সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং’ বা ‘সামাজিক দূরত্ব’ পরিভাষাটিকে আমরা হয়তো বা ভুল প্রয়োগ করে ফেলছি। এর পরিবর্তে ‘ফিজিক্যাল ডিসট্যান্সিং’ বা ‘শারীরিক দূরত্ব’ কথাটাই অনেক বেশি উপযুক্ত। করোনা রোগের হাত থেকে বাঁচতে সবাইকে যার যার ঘরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে ঠিকই কিন্তু বন্ধুবান্ধব বা পরিবার বা প্রতিবেশীর সঙ্গে সামাজিক ও মানবিক যোগাযোগ ছিন্ন করতে বলা হয়নি। বরং এই দুঃসময়ে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজনীয়তা বেশি বেড়েছে। বিশেষ করে, যাদের করোনা টেস্টে পজিটিভ রিপোর্ট এসেছে, তাদের পাশে মমতা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন আছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে যদি তাদেরকে সঠিকভাবে যত্ন করা যায়, সেবা দেওয়া যায় তাহলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তারা সুস্থ হয়ে উঠবেন।
এক জন মানুষ থেকে আরেক জন মানুষের যে দূরত্ব, যেটাকে ‘সামাজিক দূরত্ব’ বলা হচ্ছে; এই শব্দটি ‘শারীরিক দূরত্ব’ হওয়াটাই জরুরি। দুর্যোগকালীন এই সময়ে ব্যবহার করা উচিত ‘শারীরিক দূরত্ব’ বা ‘দৈহিক দূরত্ব’। অবশ্যই ‘সামাজিক দূরত্ব’ নয়। বরং এখন প্রয়োজন ‘সামাজিক নৈকট্য’। প্রয়োজনীয় শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে সামাজিক মমত্ব যত বাড়ানো যাবে, করোনা মোকাবিলায় ততই আমরা সফল হতে পারব।
এক জন মানুষ যখন একা থাকে, যখন সে নিজেকে নিসঙ্গ মনে করে, যখন সে মনে করে যে তার প্রতি কারো কোনো মমত্ব নেই, তখন বেঁচে থাকার প্রয়োজনটাও অনেক সময় তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে না। আমরা চলাফেরার ক্ষেত্রে, বাইরে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখব। কিন্তু আমাদের অন্তরের যে টান— সামাজিক মমত্বের মধ্য দিয়ে এবং দুর্গত যে-ই হোক না কেন, যিনি-ই অসুস্থ হোক, তার প্রতি মমত্বের প্রকাশ আমরা যত ঘটাব, যত দেখাতে পারব, তত তার সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা, সুস্থ হওয়ার সুযোগ বাড়বে। মানুষের ভরসা পেলে তার ভেতরের ইমিউন সিস্টেমটাও তখন বাড়তে থাকবে। মানুষের মমতা, চিকিত্সকের মমতা, আত্মীয়ের মমতা, আপনজনের মমতা যে কোনো রোগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
এই সময়ে করোনা আক্রান্ত রোগীর সেবা করলেই কেউ করোনায় আক্রান্ত হবে, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। প্রয়োজন শুধু সতর্কতা। স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রয়োজন সামাজিক মমত্ব। মমত্বটাকে যত প্রবল করা যাবে তত আমাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী হবে। এ মমত্ব শুধু করোনা আক্রান্ত রোগীকে নয়, ব্যক্তির নিজেকেও মানসিক দিক দিয়ে সুস্থ রাখতে পারে, যার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে শরীরেও। তাই করোনা কালে শারীরিক দূরত্ব বজায় যেমন থাকবে; তেমনি সামাজিক নৈকট্যেরও খুবই প্রয়োজন। মমতাময় হূদয়ে সমাজকে, দেশকে, দেশের মানুষকে উপলব্ধি করার মধ্য দিয়ে বর্তমানের দুর্যোগ মোকাবিলায় সামাজিক মমত্ব, সামাজিক নৈকট্য, সামাজিক বন্ধনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
n লেখক :হূদেরাগ বিশেষজ্ঞ ও সহযোগী অধ্যাপক, কার্ডিওলজি বিভাগ, খাজা ইউনুস আলী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল
