উন্নত বিশ্বের কারণে হুমকিতে বাংলাদেশের শ্রমবাজার

আপডেট : ০১ মে ২০২০, ১৬:২৩

করোনা মহামারিতে লকডাউন প্রায় বিশ্বের অধিকাংশ দেশ। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অধিকাংশ দেশে বন্ধ হয়ে গেছে সেখানকার বিলাসবহুল নামীদামি ব্র্যান্ডের পোশাকের  শোরুমগুলো।  ওই শোরুমগুলোতে বেচা-কেনা বন্ধ থাকায় ঝুঁকিতে পড়েছে হাজার হাজার মাইল দূরে থাকা বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের জীবিকা। 

ইউরোপের বাজারের জন্য শার্ট তৈরি করতো সাবিনা আকতার নামের এক পোশাক শ্রমিকের কারখানায়। তিনি জানান, লকডাউনের কারণে ইউরোপ থেকে সকল অর্ডার বাদ দিয়ে দেয়ার পর তার মালিক ওই কারখানাটি বন্ধ করে দিয়েছে।

 এ নিয়ে সাবিনা বলেন, আমি জানিনা কিভাবে বেঁচে থাকবো। চাকরি হারিয়েছি, এখন কিভাবে খাবার কিনবো তা জানিনা। আনিসা বেগম নামের আরেক পোশাক শ্রমিক বলেন, সরকার যদি এগিয়ে না আসে আমাদের বাঁচার কোন উপায় নেই।  খালেদা পারভিন নামের আরেক পোশাক শ্রমিক জানায়, তার মালিক কোন ঘোষণা দেয়া ছাড়াই বন্ধ করে দিয়েছে কারখানা। খালেদা বলেন,  সাধারণ ছুটি ঘোষণা করার পর আমি বাড়িতে চলে যাই। ৫ এপ্রিল ফিরে দেখি যে আমাদের কারখানা সাময়িকভাব বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। 

বিশ্বে চীনের পর বাংলাদেশই সবচেয়ে বেশি পোশাক রফতানি করে। আর ইউরোপ এবং আমেরিকার ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশের পোশাকখাত। বাংলাদেশের রাজস্বের ৮৩ শতাংশ আসে পোশাক থেকে। যেখান থেকে সরকার প্রতিবছর ৩২ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করে।   

জানা গেছে, বাংলাদেশের পোশাক কারখানায় ২০ লাখ মানুষ কাজ করেন। যার মধ্যে নারী কর্মী বেশি। করোনা প্রকোপের কারণে এ পর্যন্ত প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের অর্ডার বাতিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের পোশাকখাত সংশ্লিষ্টরা। 

 পোশাকখাতকে টিকিয়ে রাখতে ইতিমধ্যে ২ শতাংশ সুদে ৫৮৮ মিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। আর এই  প্রণোদনা দিয়ে বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের মাত্র একমাসের বেতন দেয়া সম্ভব বলে জানা গেছে। 

এদিকে বাংলাদেশের পোশাকের অর্ডার বাতিল করায় এর সমালোচনা করেছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা। তারা বলছে কোন ধরণের নৈতিক এবং আর্থিক দায়িত্ববোধ ছাড়াই এই সব অর্ডার বাতিল করে দেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে আবার অনেক পোশাক কারখানাই  তাদের অর্ডারের কাজ প্রায় সেরে ফেলেছে।  

এদিকে অর্ডার বাতিল নিয়ে সমালোচনার পর এইচ এন্ড এম এবং জারার মতো বেশ কিছু ব্র্যান্ড জানিয়েছে যে তারা কারখানার পুরো পাওনা পরিশোধ করবে। সেন্টার ফর গ্লোবাল ওয়ার্কার রাইটসের একটি জরিপ বলছে, অর্ডার বাতিল করায় ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে ব্যবসায়ী এবং শ্রমিকদের মধ্যে।  জরিপে বলা হয়, যখন অর্ডার বাতিল করা হয় তখন প্রায় ৭২ শতাংশ ক্রেতাই কাঁচামাল কেনার খরচ দিতে অস্বীকৃতি জানায় । এছাড়া ৯১ শতাংশ ক্রেতা উৎপাদন খরচ পুরোটা দিতে অস্বীকৃতি জানায়।  আর এ কারণেই জরিপ চালানো পোশাক কারখানাগুলোর ৫৮ শতাংশ গার্মেন্টসই বন্ধ হয়ে গেছে।

 তবে এত শঙ্কার মধ্যেও ঝুঁকি নিয়ে পারসোনাল প্রটেকটিভ ইকুইপমেন্ট (পিপিই) তৈরি করে যাচ্ছে বাংলাদেশের বেশ কিছু পোশাক কারখানা। যেখানে প্রায় দুই লাখ শ্রমিক কাজ করছেন । তবে কর্মস্থলে স্বাস্থ্য ঝুঁকি  থাকায় বাংলাদেশের এক পোশাক শ্রমিক সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে লেন, প্রতিদিন কাজে যাই এবং ভয়ে থাকি। আমি যেখানে কাজ  করি সেখানে ছোট জায়গায় অনেকেই একসঙ্গে কাজ করি। এতে আমাদের প্রাণ নিয়ে শঙ্কায় আছি।  

 এ বিষয়ে  বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির  (বিজিএমইএ) সভাপতি রুবানা হক বলেন, ২০ লাখেরও বেশি শ্রমিক তাদের চাকরি হারাতে পারেন। কেউই এখন শার্ট এবং ট্রাউজার কিনতে চায় না। সবাই এই মহামারিতে খাবার এবং ওষুধ কেনায় বেশি জোর দিচ্ছেন। 

 এ দিকে এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা এবং জাতিসংঘের পক্ষ থেকে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে যারা এই সংকট সমাধানের উপায় খুঁজছে।  একটি বিবৃতিতে ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক শারান বুরো বলেন, চাকরি, আয় এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবসার ধারাবাহিকতার একটি অংশ। এই বিবৃতির মাধ্যমে দরিদ্র দেশগুলোর শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষার জন্য জরুরিভাবে আহ্বান জানাচ্ছি।  

 গত ২৬ মার্চ থেকে অঘোষিত লকডাউনের মধ্যে আছে বাংলাদেশে। দেশে  এ পর্যন্ত করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৮ হাজার ২৩১ জন। মারা গেছেন ১৭০ জন। বিবিসি। 

ইত্তেফাক/এআর