ফিরে দেখা ২ ০১৮ আলোচিত যাঁরা

আপডেট : ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৯:৪৮

এ বছরের আলোচিত ব্যক্তিদের তালিকায় চোখ বোলালেই দেখা যাবে রাজনীতি, সমাজকর্ম, বিজ্ঞান এবং খেলাধুলার জগতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোড়ন তুলেছেন নারী। একটা বড় সময় ধরেই তাদের আলোচনায় মুখর ছিল বিশ্ব। বছরের আলোচিত নারীদের ঘটনার সংকলন

অ্যাঞ্জেলা মেরকেল

প্রায় এক যুগেরও কিছু বেশি সময় ধরে জার্মানির চ্যান্সেলর পদটি অধিকারে রেখেছেন অ্যাঞ্জেলা মেরকেল। দেশকে তো দারুণ দক্ষতায় পরিচালনা করছেনই, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক বিষয়াদিতেও হয়ে উঠেছেন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। যারই ফলশ্রুতিতে তিনি ফের স্বীকৃতি পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত সাময়িকী ফোর্বস-এর। ম্যাগাজিনটি বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারী ব্যক্তিত্ব হিসেবে টানা অষ্টম বারের মত নির্বাচিত করেছে জার্মান চ্যান্সেলরকে। ২০১১ সালে ফোর্বসের চোখে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারী নির্বাচিত হওয়ার পর সেটিকে এক প্রকার নিজের সম্পত্তিই বানিয়ে ফেলা মেরকেল এর আগেও এই আসনে আসীন হয়েছিলেন পাঁচবার। শরণার্থী সমস্যা সমাধান, ইউরোপের অর্থনৈতিক সংকট এবং ব্রিটেনের ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগের পর আঞ্চলিক সংস্থাটির ঐক্য ধরে রাখতে তার অগ্রগামী ভূমিকাই তাকে এই স্থান ধরে রাখতে সাহায্য করেছে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

 

ক্রিস্টিন ল্যাগার্দ

এ বছরের আলোচিত নারীদের পরের নামটি ফরাসী নারী ক্রিস্টিন ল্যাগার্দের। ২০১১ সালে প্রথম নারী হিসেবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পান ল্যাগার্দ। এর আগে বিভিন্ন মেয়াদে ফরাসী সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং কৃষি ও মত্স্য বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। ইউরোপের অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান গেল বছরে তাকে ফোর্বস সাময়িকীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীর তালিকার অষ্টম স্থানে নিয়ে এসেছিলো ল্যাগার্দকে। একই অবদানে কারণে এই বছর ফোর্বসের ক্ষমতাধর নারীর তালিকায় তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছেন তিনি।

নাদিয়া মুরাদ

তু ইয়ুয়ু এবং সভেতলানা অ্যালেক্সেইভিচের নোবেল জয়ের পর পেরিয়ে গিয়েছিলো আরও দুটো বছর। এ সময়ে

কোনো নারীই জিততে পারেননি এ গ্রহের সবচেয়ে সম্মানজনক পুরস্কার নোবেল। ২০১৮ সালে এসে নোবেল পুরস্কারে নারীদের নিরবতা ভেঙ্গেছেন নাদিয়া মুরাদ, ডোনা স্ট্রিকল্যান্ড এবং ফ্রান্সেস আরনল্ড। এদের মধ্যে প্রথমজন নোবেল জিতেছেন শান্তিতে। ডোনার অর্জন পদার্থবিদ্যায় অবদানের জন্য। ফ্রান্সেস বিজ্ঞানের রসায়ন শাখায় অসামান্য অবদান রাখার ফলে জিতেছেন নোবেল পুরস্কার।

ইরাকের সিনজারে কোজো গ্রামের এক ইয়াজিদি কৃষক পরিবারের মেয়ে নাদিয়া মুরাদ বাসি তাহা উচ্ছ্বল কৈশোরের শেষ বছরে এসে ইসলামিক স্টেটের জঙ্গিদের কবলে পড়েন। জঙ্গিদের হত্যা করা ৬০০ ইয়াজিদির মধ্যে নাদিয়া হারান তার ছয় ভাই এবং এক সত্ ভাইকে। জঙ্গিরা বন্দি করে ফেলে তাকে।  তাদের যৌন নির্যাতন থেকে বাঁচেতে সেখান থেকে পালিয়ে উত্তর ইরাকের একটি শরণার্থী শিবিরে গিয়ে আশ্রয় নেন তিনি।

২০১৫ সালে যখন রুয়ান্ডার একটি আশ্রয় শিবিরে তখন মানবেতর জীবনযাপন করছিলেন নাদিয়া তখনই বেলজিয়ান দৈনিক পত্রিকা ‘লা লিবে বেলজিক’কে সাক্ষাত্কার দেন। সে বছরই জার্মানির বাডেন-উরটেমবার্গ সরকারের শরণার্থী কর্মসূচির অধীনে জার্মানিতে পাড়ি জমান নাদিয়া। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে মানব পাচার ও যুদ্ধ ইস্যুতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বক্তব্য রাখেন তিনি। নাদিয়া এ ইস্যুতে জাতিসংঘের একজন দূতের ভূমিকা পালন করছেন। যৌন সহিংসতাকে যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার বন্ধের জন্য এবং সশস্ত্র লড়াইয়ে যৌন সহিংসতা বন্ধ করার লক্ষ্যে কাজ করার জন্য নোবেল পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হচ্ছিলেন নাদিয়া। শেষমেশ ৫ অক্টোবর শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত করে নোবেল পুরস্কার কমিটি। উল্লেখ্য, মানবাধিকার রক্ষার্থে কাজ করার জন্য এর আগে ২০১৬ সালে তিনি শাখারভ পুরস্কার জিতেছিলেন।

ডোনা স্ট্রিকল্যান্ড

এ বছর নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে ডোনা তৃতীয় নারী হিসেবে পদার্থবিদ্যায় এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন ডোনা স্ট্রিকল্যান্ড। ডোনা স্ট্রিকল্যান্ড লেজার নিয়ে  গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবনের জন্য মার্কিন বিজ্ঞানী   আর্থার অ্যাশকিন এবং ফরাসি বিজ্ঞানী জেরার্ড মৌরৌকে সাথে নিয়ে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন। রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস সম্প্রতি ঘোষণা করে তাদের নাম। তারা তিনজন মিলে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও সার্জারিতে লেজার ব্যবহারের নতুন উপায় আবিষ্কার করেছেন। ১০ ডিসেম্বর সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।

পদার্থবিদ্যা সম্পর্কে পুরুষতান্ত্রিক ফিসফাস ভারী হচ্ছিলো ক্রমেই। জেনেভার সার্ন গবেষণা কেন্দ্রের পদার্থবিদ্য আলেসান্দ্রো স্ট্রোমিয়া তো বলেই বসলেন ‘পদার্থবিদ্যা পুরুষদের হাতে গড়া বিজ্ঞানের শাখা’। পরে এই মন্তব্যের জন্য অবশ্য তাকে বহিষ্কৃত হতে হয়। স্ট্রোমিয়ার এমন মন্তব্য যে কেবলই বাতুলতা সেটা ডোনা কাজে পরিণত করে দেখালেন নোবেলের জন্য মনোনীত হয়ে।

আর্থার আসকিন জৈবিক পদ্ধতি গবেষণায় ব্যবহূত অপটিক্যাল টুইজার্স হিসেবে লেজার কৌশল উন্নত করার জন্যে এবং মুউরো ও ডোনাকে উচ্চ তীব্রতা সৃষ্টি এবং খুব দ্রুত লেজার পালসের প্রক্রিয়া উন্নতি করতে কাজ করার জন্য নোবেল দেওয়া হয়। ক্যানসার রোগের চিকিত্সায় তাদের আবিষ্কার ভূমিকা রাখছে বলে জানায় নোবেল কমিটি।

 

ফ্রান্সেস আরনল্ড

এ বছর ১১৭ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো আমেরিকার নারী হিসেবে রসায়নে নোবেল পুরস্কার জেতেন ফ্রান্সেস এইচ আরনল্ড। বিবর্তনবাদের ধারণাকে গবেষণাগারে টেনে এনে নতুন এনজাইম তৈরির মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি এবং রোগ প্রতিরোধী ওষুধ তৈরির পথ দেখানোর জন্য জর্জ পি স্মিথ এবং ব্রিটিশ গবেষক স্যার গ্রেগরি পি উইন্টারকে সাথে নিয়ে এ বছরের রসায়ন শাস্ত্রের নোবেল জিতে নিলেন আরনল্ড।

প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে মেকানিক্যাল অ্যান্ড এরোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক পড়ার সময়ে তার বিষয়ের বাইরেও অর্থনীতি, রুশ ভাষা এবং ইতালীয় ভাষা শেখেন। একটা সময়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে স্নাতকোত্তর করারও ইচ্ছে পোষণ করেছিলেন তিনি। ইতালি সফরে নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরের বিভিন্ন অংশ তৈরি কারক ফ্যাক্টরিতে কাজ করেন তিনি। এরপর যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে উচ্চতর শিক্ষায় মনোনিবেশ করেন তিনি।

প্রিন্সটন্স সেন্টার ফর এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল স্টাডিজ নামক প্রতিষ্ঠানে রবার্ট সকোলোর নেতৃত্বে একদল বিজ্ঞানী এবং প্রযুক্তিবিদ টেকসই শক্তির উত্স তৈরি এবং উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছিলেন। পরে এ বিষয়েই কাজ করা শুরু করেন ফ্রান্সেস। সেখান থেকে স্নাতকোত্তীর্ণ হবার পর ১৯৮৫ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে রাসায়নিক প্রযুক্তির উপর পিএইচডির জন্য পড়াশোনা শুরু করেন ফ্রান্সেস।

পিএইচডি অর্জনের পর বায়োফিজিক্যাল রসায়নের উপর ডক্টরেট পরবর্তী গবেষণা শুরু করেন। ১৯৮৬ সালে ক্যালিফোর্নিয়া ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজিতে সফরকারী সহকারী হিসেবে যোগ দেন। পরে তিনি সহকারী প্রভাষক পদে উন্নীত হন। ১৯৯৬ সালে ফ্রান্সেস আরনল্ড ক্যালটেকের পূর্ণকালীন অধ্যাপক হন। এখানেই তিনি প্রথমবারের মতো নিয়ন্ত্রিত উপায়ে এনজাইম তৈরি করার উপায় আবিষ্কার করেন যা তাকে এনে দিয়েছে নোবেলের সম্মাননা।

 

আদা হেগারবার্গ

 

ফুটবলে নারী সমতা বিধান এবং সমান সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে এবারই প্রথম নারীদের ফুটবলে বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার ‘ব্যালন ডি’অর ফেমিনিন’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ‘ফ্রান্স ফুটবল’ নামক ম্যাগাজিনটি। পুরস্কারটি প্রথমবারের মতো জেতার সম্মান অর্জন করে ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিলেন অলিম্পিক লিঁওর নরওয়েজিয়ান স্ট্রাইকার আদা হেগারবার্গ।

গত মৌসুমটি দারুণ কাটিয়েছেন নরওয়ে প্রমীলা ফুটবল দলের এই খেলোয়াড়। ঘরোয়া ফুটবলে ফরাসি দল লিঁওকে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতানোর নাম ভূমিকায় ছিলেন, ভলফসবুর্গের বিপক্ষে ফাইনালটিতে করেছিলেন একটি গোলও। এছাড়াও দলের ফরাসি লিগ শিরোপা জয়ে রেখেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। বছর জুড়ে এমন নৈপুণ্যই তাকে এনে দিয়েছে নারী ব্যালন ডি’অরের সম্মান।

 

মেগান মার্কেল

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বছরের একটা বড় সময় ধরে আলোচনায় ছিলেন ব্রিটিশ রাজপরিবারের নতুন সদস্য মেগান মার্কেল। গেল ১৯ মে ব্রিটিশ রাজপরিবারের কনিষ্ঠ পুত্র প্রিন্স হ্যারির সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন মেগান। বছরের শুরুতে তিন ধরণের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকেই বিদায় নিয়ে আলোচনায় আসেন মেগান। তার খাবার, রূপসজ্জা, ভ্রমণ বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘টিগ’ও বাগদানের কিছুদিন আগে বন্ধ করে দেন তিনি। এরপর মে মাসের মাঝামাঝিতে অনুষ্ঠিত হয় বছরের সবচেয়ে আলোচিত বিয়ের অনুষ্ঠানটি।