শাহাদাত হোসাইন স্বাধীন
একটি ব্যর্থ আরব বসন্তের মধ্যে ২০১১ সালে ন্যাটো জোটের সামরিক অভিযানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে প্রাণ হারান ৪২ বছর ধরে লিবিয়া শাসন করা লৌহমানব মুয়াম্মার গাদ্দাফি। কিন্তু গাদ্দাফির পতনের পর এক দশকেও শান্তি ও স্থিতিশীলতা আসেনি লিবিয়ায়। দশক ধরে চলা গৃহযুদ্ধের ফলে বর্তমানে এক দেশে দুই সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জাতিসংঘ স্বীকৃত জাতীয় সরকার দেশের পশ্চিমাঞ্চল এবং বিদ্রোহী সরকার দেশের পূর্বাঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে। বিশ্বশক্তি ও মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশগুলো এই দু্ই সরকারকে সমর্থন করা নিয়ে বিভক্ত। এই বিভক্তির নেপথ্যে রয়েছে রাজপরিবারকেন্দ্রিক দেশগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান ও বিশ্বশক্তিগুলোর তেল ও অস্ত্র বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ।
গৃহযুদ্ধ নিরসনে ২০১৫ সালে গৃহযুদ্ধ ও সংঘর্ষ এড়াতে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে বিবদমান গোষ্ঠীর মধ্যে সমঝোতা সই হয়। গাদ্দাফি সরকারের স্থলাভিষিক্ত করার জন্য সেখানে ‘গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল অ্যার্কড’ নামে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত জাতীয় সরকার গঠন করা হয়। জাতীয় সরকারের প্রধান করা হয় ফায়াজ আর সারাজকে। কিন্তু রাশিয়া, ফ্রান্স, আরব আমিরাত ও মিশরের সমর্থনে লিবিয়ার জাতীয় সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করতে চায় বিদ্রোহী জেনারেল খলিফা হাফতাব। ত্রিপোলিভিত্তিক জাতীয় সরকার আলজেরিয়ার সীমান্ত ঘেঁষা লিবিয়ার পশ্চিমাঞ্চল অন্যদিকে খলিফা হাফতাবের নেতৃত্বাধীন বেনগাজিভিত্তিক লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (এলএনএ) মিশর সীমান্তঘেঁষা পূর্বাঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে।
২০১৯ সালের ৪ এপ্রিল জাতিসংঘসমর্থিত জাতীয় সরকারকে হঠাতে সামরিক অভিযানে নামেন খলিফা হাফতাব। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় সরকারের সমর্থক হলেও ডোনাল্ট ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভোল পালটাতে থাকে হোয়াইট হাউজ। ক্ষমতায় এসে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘লিবিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা পালনের কোনো অবকাশ তিনি দেখছেন না।’
সামরিক অভিযান চলাকালে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস জাতীয় সরকারের পক্ষে বিবৃতি দেন। লিবিয়ার জাতীয় সরকারকে সমর্থন জানায় জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইতালি, তুরস্ক, কাতার ও আলজেরিয়া। জাতীয় সরকার মুসলিম ব্রাদারহুডপন্থি হওয়ায় কাতার ও তুরস্ক জাতীয় সরকারের সমর্থক হলেও ইতালির মূল স্বার্থ তেল। ইতালির বেশ কয়েকটা তেল কোম্পানির লিবিয়ায় বড়ো ধরনের বিনিয়োগ রয়েছে।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোয়ানের যৌথ যুদ্ধ বিরতির আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১২ জানুয়ারি মস্কোতে লিবিয়ার দুই পক্ষ আলোচনায় বসলেও কোনো সমঝোতা হয়নি। মস্কো বৈঠক ব্যর্থ হলে তুরস্ক জাতীয় সরকারের সমর্থনে সেনা পাঠানোর ঘোষণা দেয়। অন্যদিকে হাফতাবদের সমর্থনে রাশিয়ার জন্য লড়াই করার কথা গত সেপ্টেম্বরেই স্বীকার করেছিলেন পুতিন।
এই জটিল পরিস্থিতিতে ১২ জানুয়ারির পর জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেইকো মাস লিবিয়া সফর করে দুই পক্ষকেই সম্মেলনে বসাতে রাজি করান। অবশেষে ১৯ জানুয়ারির কাঙ্ক্ষিত বার্লিন সম্মেলনে যোগ দেয় লিবিয়ার বিবদমান দুই পক্ষ। জাতিসংঘের মহাসচিব ও জার্মান চ্যান্সেলরের যৌথ সভাপতিত্বে এই সম্মেলনে রুশ প্রেসিডেন্ট, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী, ফরাসি প্রেসিডেন্ট, তুর্কি প্রেসিডেন্ট, ইতালির প্রধানমন্ত্রী এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ ১৬ দেশ ও বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা যোগ দেন।
সম্মেলন চলাকালে তুরস্ক প্রেসিডেন্ট দেশ ছাড়ার আগে বলেন, বার্লিন সম্মেলন ব্যর্থ হলে আইএস ও আল-কায়েদার উর্বর ভূমি হয়ে উঠবে লিবিয়া। সম্মেলন শেষ করে জার্মান চ্যান্সেলর বলেন, লিবিয়ায় আর অস্ত্রের ঝনঝনানি নয়। উভয় পক্ষই যুদ্ধ বিরতির জন্য একটি সমন্বিত চুক্তিতে পৌঁছতে সমর্থ হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, লিবিয়ায় শান্তি ফেরা একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। সে আশঙ্কায় যুক্ত হয়েছে খলিফা হাফতাবের নতুন সরকার গঠন। গত সোমবার খলিফা হাফতাব ২০১৫ সালের জাতিসংঘের মধ্যস্থতা চুক্তিকে বাতিল করে নতুন সরকারের ঘোষণা দেন। তিনি দাবি করেন তার অনুগত গেরিলা সেনারা পুরো দেশের নিয়ন্ত্রণ করছে। সিরিয়ার মতো বিশ্বশক্তিগুলো নিজ নিজ স্বার্থে লিবিয়ায় যুক্ত হয়েছে। সৌদি আরব ও আরব আমিরাত তাদের পার্শ্ববর্তী দেশে রাজনৈতিক ইসলামকে কোনোভাবে বরদাশত করতে রাজি না। বাকিদের স্বার্থ হলো তেলের বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ আর অস্ত্র বিক্রি। এই তেল ও অস্ত্র বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কাড়াকাড়ির ফলে গত এক দশকে বিশ্বশক্তিগুলো নানা সম্মেলন, চুক্তি ও অঙ্গীকারের করলেও শেষ পর্যন্ত লিবিয়ার গৃহযুদ্ধ থামেনি। বিদ্রোহী খলিফা হাফতাবের নতুন সরকারকে সমর্থন করা নিয়ে আবার বাক্যুদ্ধ ও প্রক্সিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে বিশ্বশক্তিগুলো। ফলে এক দশকের গৃহযুদ্ধ দুই সরকারের বিভক্ত লিবিয়াকে আরো বড়ো যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
