করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে চলমান লকডাউনের মধ্যেই সীমাহীন ভোগান্তি নিয়ে পোশাক কারাখানার শ্রমিকরা কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে ছুটছেন। কোনোভাবেই তাদের এ যাত্রা বন্ধ করা যাচ্ছে না। চাকরি বাঁচাতে হেঁটে, রিকশা-ভ্যানে, মোটরসাইকেল, পিকআপ, ইজিবাইক, পণ্যবাহী ট্রাক, এমনকি বাস-মাইক্রোবাস রিজার্ভ করেও শ্রমিকরা ঢাকার দিকে আসছেন।
গত বৃহস্পতিবার রাতে গাইবান্ধায় ৫ শতাধিক পোশাক শ্রমিকসহ ঢাকামুখী ৯টি নৈশকোচ আটক করেছে পুলিশ। পরে যাত্রীদের বাড়ি পাঠানো হলেও গাড়িগুলোর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এদিকে সাভারে ছাঁটাইয়ের প্রতিবাদে ও গাজীপুরে কাজে যোগ দেওয়ার দাবিতে মহাসড়কে বিক্ষোভ করেছেন পোশাক শ্রমিকরা।
সাদুল্লাপুর থানার ওসি মাসুদ রানার বরাত দিয়ে গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, বৃহস্পতিবার রাতে রংপুরের পীরগাছা উপজেলার চৌধুরাণী, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের হাসানগঞ্জ, বামনডাঙ্গা ও সাদুল্লাপুরের নলডাঙ্গা থেকে সাড়ে ৩ শতাধিক যাত্রী (পোশাক শ্রমিক) নিয়ে ছয়টি নৈশকোচ ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। খবর পেয়ে পথে সাদুল্লাপুরের নলডাঙ্গা ঘাঘট ব্রিজে বাসগুলো আটক করা হয়।
এছাড়া গাইবান্ধা সদর থানার ওসি খাঁন মোহাম্মদ শাহারিয়া জানান, একই রাতে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে কোনোপ্রকার অনুমতি ছাড়াই ৩টি ঢাকাগামী নাইটকোচ ১৫০ জন যাত্রী (পোশাক শ্রমিক) নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। খবর পেয়ে শহরের নতুন ব্রিজ এলাকা থেকে নাইটকোচসহ যাত্রীদের আটক করে থানায় নিয়ে আসা হয়। রাতেই যাত্রীদের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে বাসগুলোর বিরুদ্ধে নতুন পরিবহন আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে ওসিরা জানান।
চৌধুরাণী থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া শ্রীপুরের ডিবিএল গার্মেন্টসের শ্রমিক বাবলু মিয়া জানান, শনিবার তাদের কারখানায় যোগ দিতে বলা হয়েছে। না হলে ছাঁটাই করা হতে পারে। তাই ঝুঁকি নিয়ে ৫০০ টাকার জায়গায় হাজার ৫০০ টাকা ভাড়া দিয়ে কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য রওনা হয়েছিলাম। হাসানগঞ্জ থেকে রওনা হওয়া নুর মোহাম্মদ সাভারের পল্লী বিদ্যুত্ এলাকার একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। তিনি বলেন, চাকরিটা চলে গেলে কী খাব। নতুন করে আবারও চাকরি পাওয়া যাবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই আর কোনো ভোগান্তির কথা এসময় মনে আসে নাই। বামনডাঙ্গা থেকে গাজীপুরে উদ্দেশ্যে আযাদ পরিবহনে রওনা হওয়া সোহাগী বেগম জানান, কাজে যোগ না দিলে বেতন-ভাতা দিবে না। তাই হাজারো দুর্ভোগ সহ্য করে ১ হাজার টাকা ভাড়ায় বাসে রওনা হয়েছি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গাইবান্ধার এক শ্রমিক নেতা জানান, দীর্ঘদিন থেকে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় আমরা কর্মহীন হয়ে পড়েছি। সংসার তো আর চলছে না। তাই সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে ম্যানেজ করে কিছু বাস যাত্রী পরিবহন করছে। স্থানীয় ট্রাফিক ইন্সপেক্টর নুর আলম সিদ্দিক জানান, এ পর্যন্ত চার মাইক্রোবাসসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় পোশাক শ্রমিকসহ ২০টি বাস আটক করা হয়েছে। এই অভিযান চলবে।
সাভার থেকে ইত্তেফাক রিপোর্টার জানান, চারাবাগ এলাকার এলাইন এ্যাপারেলস লিমিটেড কারখানায় শ্রমিক ছাঁটাইয়ের প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছে শ্রমিকরা। তারা ছাঁটাই বন্ধ এবং ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদেরকে চাকরিতে পুনর্বহালের দাবিতে প্রায় তিন ঘণ্টা কারখানার সামনের সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। পরবর্তীতে শ্রমিকদের বিক্ষোভের মুখে শিল্প পুলিশের হস্তক্ষেপে কারখানা কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের কাজে পুনর্বহাল করলে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
শিল্প পুলিশ ও বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা জানান, এলাইন এ্যাপারেলস কারখানায় দেড় হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করে। সম্প্রতি এ শ্রমিকদেরকে দফায় দফায় ছাঁটাই করছে কারখানা কর্তৃপক্ষ। এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার সকালে যাদের চাকরির বয়স দুই থেকে তিন মাস এমন দুই শতাধিক শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়। এর আগে গত বৃহস্পতিবার কমপক্ষে ৪০ জন শ্রমিককে ছাঁটাই করে কারখানা কর্তৃপক্ষ। তাই গতকাল সকালে সকল শ্রমিক একযোগে কারখানার সামনের সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে।
আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১ এর সিনিয়র এএসপি আউয়াল হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। ছাঁটাইয়ের বিষয়ে জানতে কারখানাটির প্রশাসনিক কর্মকর্তা লিটন আহমেদের ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
অপরদিকে আশুলিয়ার বারইপাড়া এলাকার রোজ ইন্টিগ্রেটস নামের একটি পোশাক কারখানায় ঢুকতে না পেরে বিক্ষোভ করছে শ্রমিকরা। জানা গেছে, সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মাত্র ৩০ ভাগ শ্রমিককে কারখানার ভেতরে ঢুকতে দিয়ে বাকিদের বাসায় চলে যেতে বলা হয়। কারখানার ভেতরে ঢুকতে না পারা শ্রমিকেরা ছাঁটাই আতঙ্কে বিক্ষোভে অংশ নেয়। পরে পুলিশ তাদের ছাঁটাই করা হবে না বলে আশ্বাস দিলে তারা বাসায় চলে যায়।
এদিকে সাভারে করোনা আক্রান্ত সাত শ্রমিকের কারখানার নাম প্রকাশ, কারখানা ও অন্যান্য এলাকার সঙ্গে সংযোগস্থল লকডাউনের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতি। গতকাল শনিবার সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আখতার ও সাধারণ সম্পাদক জুলহাসনাইন বাবু এক যৌথ বিবৃতিতে এ দাবি জানান। নেতৃবৃন্দ আরো বলেন, এই সময় যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া কারখানা খোলা একটি ভুল সিদ্ধান্ত।
গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, তারগাছ এলাকায় অনন্ত ক্যাজুয়াল ওয়্যার লিমিটেড কারখানায় করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সামাজিক দূরত্ব মেনে কাজ করছেন দেড় থেকে দুই হাজারের মতো শ্রমিক। শনিবার বাকিরা (প্রায় এক হাজার শ্রমিক) কাজে যোগ দিতে গেলে কর্তৃপক্ষ তাদের কারখানায় প্রবেশ করতে বাধা দেয়। পরে শ্রমিকরা কারখানার প্রধান ফটকে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। এক পর্যায়ে তারা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করেন।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুশান্ত সরকার জানান, কর্তৃপক্ষ আগামীকাল থেকে শ্রমিকদের কাজে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দিলে শ্রমিকরা মহাসড়ক ছেড়ে দেয়। কারখানার কোনো শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়নি বলেও তিনি জানান। প্রসঙ্গত, গাজীপুরের মোট ২ হাজার ৭২টি কারখানার মধ্যে শনিবার পর্যন্ত ৮৭৩টি শিল্পকারখানা খুলেছে।
ভালুকা (ময়মনসিংহ) সংবাদদাতা জানান, উপজেলায় ছোটো-বড়ো মিলিয়ে প্রায় দেড় শতাধিক পোশাক কারখানা রয়েছে। বিজিএমইর সিদ্ধান্ত মোতাবেক বলা হয়েছিল দূর থেকে কোনো শ্রমিক না এনে সীমিত পরিসরে গার্মেন্টস চালু করার। কিন্তু বাস্তবে ঘটছে উলটো চিত্র। চাকরি হারানোর ভয়ে দূর থেকে হাজার হাজার শ্রমিক কাজে যোগ দিয়েছেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত হতে রিকশা, ভ্যান, ট্রাকে করে কিংবা পায়ে হেঁটে শত শত শ্রমিক আসছেন ভালুকায়।
আরো পড়ুন: পোশাকশিল্পে করোনা রোগী বাড়ছে
ভরাডোবা হাইওয়ে পুলিশের ইনচার্জ ওযায়ের আল মাহমুদ আদনান জানান, গত রবিবার থেকে মহাসড়ক দিয়ে প্রচুর পোশাক শ্রমিক তাদের কর্মস্থলে যোগ দিয়েছে। আমরা তাদেরকে ট্রাক থেকে নামিয়ে দিলেও তারা হেঁটেই কর্মস্থলে যোগদান করে। শিল্প পুলিশ ময়মনসিংহ অঞ্চল-৫-এর পুলিশ সুপার (এসপি) মো. সাহেব আলী পাঠান জানান, ভালুকায় এ পর্যন্ত ৮১টি কারখানা চালু হয়েছে। দূর থেকে শ্রমিক না আনতে তাদের বার বার বলা হচ্ছে। তবে আমরা যতটুকু দেখছি তারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার চেষ্টা করছে। তবে কারখানায় ঢুকতে ও বের হওয়ার সময় শ্রমিকরা সামাজিক দূরত্ব মানছে না।
শিমুলিয়া ঘাটে পোশাকশ্রমিকদের ঢল
মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, জেলার লৌহজং উপজেলার শিমুলিয়া ফেরিঘাটে শনিবারও ছিল ঢাকামুখী পোশাকশ্রমিকদের ঢল। কর্মস্থলে যেতে শিমুলিয়া ঘাটে সকাল থেকে হুমড়ি খেয়ে পড়েন শ্রমিকরা। এদের অধিকাংশই ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ কিংবা গাজীপুরে বিভিন্ন ফ্যাক্টরিতে কাজ করেন। শিমুলিয়া ঘাটে আসা শ্রমিকদের কথা—কষ্ট যতই হোক, আগে চাকরি বাঁচাতে হবে। তাই ছোটো ছোটো যানবাহনে চড়ে সড়কে ভেঙে ভেঙে ঢাকায় ছুটছেন তারা।
টানা ছয় দিন ধরে দক্ষিণবঙ্গের কাঁঠালবাড়ি ঘাট থেকে ফেরি ও ট্রলারে করে হাজারো শ্রমিক পদ্মা পাড়ি দিয়ে আসছেন মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাটে। সামাজিক দূরত্ব না মেনে ফেরি ও ট্রলারে গাদাগাদি করে আসছেন তারা। মাওয়া নৌ-ফাঁড়ির ইনচার্জ সিরাজুল ইসলাম জানান, ফেরি ও ট্রলারে গাদাগাদি করে শ্রমিকরা ছুটে আসার কারণে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে। তবু তাদের ঢাকায় ছুটে চলা থামানো যাচ্ছে না।
ইত্তেফাক/এএএম
