অণুগল্প

মন্টাই

আপডেট : ০৩ মে ২০২০, ২১:০৮

 

ঘরে থাকার অভ্যাস মন্টাইয়ের একেবারেই নেই। যেভাবেই হোক সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে সে বের হবেই। বাবার চোখ গরম, মায়ের বকা, নৈরিতাদের ক্যারাম খেলা, সানাইয়ের দরজা আঁটা—থোড়াই কেয়ার করে মন্টাই। কোথায় কোথায় যে ছুটতে থাকে তার ঠিক-ঠিকানা নেই। সে জানে কোন গাছের ডালে, কোন ঝোপঝাড়ে কোন পাখিদের ঘর-সংসার। পাখিদের ডাক তাকে আনমনা করে দেয়।

স্কুলে গণিত ক্লাসে স্যারের ব্লাকবোর্ডে অঙ্ক কষা চকের শব্দ আর পাখিদের কিচিরমিচির সব একাকার হয়ে যায় মন্টাইয়ের কাছে। এসবের মধ্যে অঙ্ক যে কোথায় হারিয়ে যায়। পাখির ডাক শুনে সে বুঝতে পারে কোন ঝোপে বসে কোন পাখি ডাকছে। অথচ সমাজ স্যারের পড়া তার কানেই ঢোকে না। জানালা দিয়ে সে তাকিয়ে থাকে ঝিলপাড়ের দিকে— ওখানেই তো থাকে বালিহাঁসের দল। ঝাঁকবেঁধে তারা কোথায় উড়ে যায় কে জানে। আবার ফেরেও দল বেঁধে। মন্টাইয়ের খুব পাখি হতে ইচ্ছে করে। ওমনি ডাহুকের মতো নির্জন দুপুরে পুকুরপাড়ে ডুমুরের ডালে বসে মন কেমন করা ডাক ডাকতে ইচ্ছে করে। সে কথা সে কাকে বলবে! যে-ই শোনে বলে, পাগল হলি নাকি? বাবা শুনলে...

সে কিন্তু পাগল নয়। বরং ওদের কথা শুনে মন্টাই খুব মন খারাপ করে। কিন্তু পলাশের ঝোপে মুনিয়াটা ডেকে উঠলেই মন খারাপের বস ধুলোবালি ঝেড়ে ফেলে দেয়। ছুটে যায় রূপাইদের বাগানে। ততক্ষণে আরেকটা পাখি ডেকে ওঠে। খুব অচেনা লাগে। কেমন যেন! এ কণ্ঠ তো কখনো শোনেনি! তবে কি...না, মনে করতে পারে না মন্টাই।

আজ অনেক দিন হলো তার স্কুল বন্ধ। ঘর থেকে সবার বের হওয়া নিষেধ। দেশে করোনা ভাইরাস ঢুকেছে তাই এই ব্যবস্থা। শুধু এ দেশে নয়  এ অবস্থা আজ সারা বিশ্বের। মন্টাইয়ের বাবা ঢাকা থেকে চলে এসেছেন। তিনি যখনই বাড়ি আসেন সবার জন্যে কিছু না কিছু নিয়ে আসেন। এবার শুধু মন্টাইয়ের জন্য।

খাঁচায় ভরা দুটো ময়না পাখি মন্টাইয়ের হাতে দিয়ে বললেন, এই নাও। সারা দিন বনে-বাদাড়ে পাখির পিছে পিছে ঘুরে বেড়াও। এবার খুশি তো?

—আমি খাঁচায় বন্দি পাখি চাই না বাবা।

বলতে বলতে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে মন্টাই। কাঁদতে কাঁদতেই খাঁচার দরজাটা খুলে দেয় সে।