করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে মানুষ আজ তটস্থ। এই সময় সংঘবদ্ধ চোরাকারবারিরা যেন মওকা পাইয়া গিয়াছে। রাজশাহীর রেলওয়ে স্টেশনে তেল চুরির ঘটনার জের শেষ না হইতেই এইবার মোংলা বন্দরে বিদেশি জাহাজ হইতে তেল চুরির খবর পাওয়া গিয়াছে। শুধু তেল নহে, জাহাজ হইতে মূল্যবান যন্ত্রাংশ ও মালামাল পাচারেরও অভিযোগ উঠিয়াছে। বন্দরের হারবার বিভাগ সূত্রে জানা যায়, প্রতি মাসে ২৫ হইতে ৩০টি এলপিজিবাহী জাহাজ মোংলা বন্দরে নোঙর করিয়া থাকে। এপ্রিল মাসে ২৪টি জাহাজ এলপিজি নিয়া আসিয়াছে এই বন্দরে। আর এই সকল জাহাজ হইতেই তেল চুরি হইতেছে। প্রতিটি জাহাজ হইতে রাতের অন্ধকারে ২০ হইতে ৫০ টন তেল (ডিজেল ও মবিল) পাচারের ঘটনা ঘটিতেছে। যাহারা বন্দরের নিরাপত্তার দায়িত্বে রহিয়াছেন, তাহারা এই সময় নাকে তেল দিয়া ঘুমাইতেছেন কি না সেই অভিযোগও উঠিয়াছে।
জানা মতে, মোংলার মামার ঘাটসংলগ্ন রিজেকশন গলির কয়েক জন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী এই অনৈতিক কাজে জড়িত। তাহাদের সহিত স্থানীয় শিপিং এজেন্টের যোগসাজশ থাকা অস্বাভাবিক নহে। এমনকি জাহাজের নাবিকও অনেক সময় ইহার সহিত জড়িত থাকিতে পারে। এই চক্রের সদস্যরা রাতারাতি আঙুল ফুলিয়া কলাগাছ বনিয়া যাইতেছে। এই অবৈধ কারবার বন্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় চোরাকারবারিদের আরো পোয়াবারো হইতেছে। তাহারা প্রতিনিয়ত বিদেশি জাহাজ হইতে বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেলসহ মূল্যবান সামগ্রী চুরি করিয়া কালোবাজারে বিক্রয় করিয়া দিতেছে। জাহাজে কাস্টমসের প্রিভেনটিভ অফিসার (পিও) থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তেল পাচার হইতেছে, তাহা বোধগম্য নহে। এই ব্যাপারে বন্দর কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করিয়াও ইহার কোনো সুরাহা হইতেছে না। বন্দর আইন অনুযায়ী জাহাজে ওয়াচম্যান বুকিং বা নিয়োগ দিতে হয়। যদি কোনো শিপিং এজেন্ট এই আইন অমান্য করে, তাহলে তাহাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। কেননা গত এক মাসে এই বন্দরে যে এলপিজির জাহাজ আসিয়াছে, তাহার মধ্যে অন্তত সাতটি জাহাজে ওয়াচম্যান বুকিং দেওয়া হয় নাই এবং এই সুযোগে সেই সাতটি জাহাজ হইতেই তেল, মবিলসহ মূল্যবান যন্ত্রাংশ পাচার হইবার ঘটনা ঘটিয়াছে। জাহাজে ওয়াচম্যান বুকিং তথা নিয়োগ দেওয়া থাকিলে এই সকল পাচারকর্ম কোনোভাবেই সম্ভব হইত না বলিয়া জানা যায়।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাগেরহাট জেলায় অবস্থিত মোংলা বন্দর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর। বন্দরটি ১ ডিসেম্বর ১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ঐতিহ্যবাহী এই বন্দরটির সুনাম আন্তর্জাতিকভাবে ক্ষুণ্ন হউক তাহা কাহারো কাম্য হইতে পারে না। এই জন্য এই সংঘবদ্ধ চোরাকারবারিদের অবশ্যই গ্রেফতার করিয়া আইনের হস্তে সোপর্দ করিতে হইবে। ইতিমধ্যে এই ব্যাপারে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ ও কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনে (মোংলা সদর দপ্তর) যে অভিযোগ দায়ের করা হইয়াছে তাহার ভিত্তিতে বিষয়টি তদন্ত করিয়া দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বন্দরে চোরাচালানবিরোধী অভিযান পরিচালনা অব্যাহত রাখা জরুরি। অন্যদিকে যেই সকল শিপিং এজেন্ট আইন অনুযায়ী ওয়াচম্যান নিয়োগ প্রদান করে নাই, তাহাদের তালিকা তৈরি করিয়া ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। চট্টগ্রাম বন্দরেও কোটি কোটি টাকার তেল চুরির অভিযোগ পাওয়া যায় মাঝেমধ্যে। অতএব, সর্বাগ্রে আমাদের বন্দরসমূহের নিরাপত্তা জোরদার করিতে হইবে।
