করোনা প্রতিরোধ :জনসচেতনতার হাল ও অর্থনৈতিক প্রণোদনা

আপডেট : ০৩ মে ২০২০, ২১:৩২

সৈয়দ মো. রফিকুল ইসলাম

করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) এখন সকল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। অপ্রতিরোধ্য এই ভাইরাসের তাণ্ডবে সৃষ্ট মহামারিতে যে মৃত্যুর মিছিল চলছে তাতে যে কেউ, যে কোনো দিন শামিল হতে পারে। বিশ্বের নানা দেশে সাধারণ মানুষের সঙ্গে চিকিত্সা সেবাদানকারী ডাক্তার, নার্স, মেডিক্যাল স্টাফরাও লাশের মিছিলে শামিল হচ্ছে। গতকালের সর্বশেষ খবর অনুযায়ী বিশ্বে করোনায় আক্রান্তের মোট সংখ্যা ৩৪ লাখ ৪০ হাজার ৯০৪ এবং মৃত্যুর সংখ্যা ২ লাখ ৪৩ হাজার ৯২২ জন। আধুনিক চিকিত্সাশাস্ত্রে করোনা ভাইরাসের চিকিত্সা নেই। তাই বিশ্ব আজ করোনা ভাইরাসের প্রতিষেধক/ভ্যাকসিন আবিষ্কারের জন্য পুরোদমে গবেষণা চালাচ্ছে।

করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কারের জন্য বিশ্বের প্রায় ২০টি দেশে পরীক্ষানিরীক্ষা চলছে। গত ২৩ এপ্রিল ২০২০ তারিখে যুক্তরাজ্যে পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম মানবদেহে ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হয়েছে। এই ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা প্রমাণিত হতে প্রায় ছয় থেকে আট মাস সময় লাগবে। মাঝেমধ্যে কিছু আশার কথা শোনা গেলেও পরিপূর্ণ কোনো প্রতিষেধক এখনো বের হয়নি। সাধারণ ওষুধের মধ্যে জাপান ফ্লু, ম্যালেরিয়ার ওষুধ, কিছু অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের ব্যবহার হচ্ছে। ভারত, যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশ প্লাজমা প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে করোনার চিকিত্সার কার্যকারিতা পরীক্ষা করছে। কয়েকটি দেশ ইবোলা ভাইরাসের ভ্যাকসিন ব্যবহারের চিন্তা করছে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক এখনো এ বিষয়ে কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। তাই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাই এখন পর্যন্ত একমাত্র কার্যকর প্রতিরোধ কৌশল।

সরকারের নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ সামাজিক দূরত্ব, লকডাউন, হোম কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশন পুরোপুরি মানছে না। হাটে-ঘাটে-মাঠে, বাজার-মহল্লায় এখনো হাজারো মানুষের ভিড়। ঢাকায় গার্মেন্টস শ্রমিকদের আসা-যাওয়ার স্রোতে ছিল না কোনো সামাজিক দূরত্ব, ফলে শ্রমিকরাও ঝুঁকিতে পড়ল। দুই দিন আগে আবার সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো। বিদেশফেরত সকলে কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে গেল না, ১৪ দিন হোম কোয়ারেন্টাইনও যথাযথ মানল না। গতকাল পর্যন্ত দেশে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৯ হাজার ৪৫৫ এবং মৃত্যুর সংখ্যা ১৭৭ জন। এই সংখ্যা কোথায় গিয়ে থামবে আমরা কেউ জানি না। ঈদ সামনে রেখে ইতিমধ্যে আবার কিছু দোকানপাটও খোলা শুরু হয়েছে, জানি না আমরা হাঁটছি কোন পথে।

বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ যখন নিজস্ব কাজকর্ম বাদ দিয়ে ঘরে বন্দি হয়ে আছে, তখন মানুষের বেঁচে থাকার শক্তি অর্থনীতি অচল হয়ে পড়ছে, মন্দা-মহামন্দার সমূহ সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশ, যার অর্থনীতির বড়ো চালিকাশক্তি বৈদেশিক মুদ্রা বা রেমিট্যান্স, সেই রেমিট্যান্স যাদের মাধ্যমে আসবে তাদের তো ইনকাম বন্ধ, অনেকের চাকরি নেই, অনেকে দেশে ফিরে এসেছেন। গার্মেন্টস সেক্টর আমাদের অর্থনীতির আর এক বড়ো চালিকাশক্তি; সেই গার্মেন্টস এখন প্রায় বন্ধ, নতুন অর্ডার নেই, যা ছিল তাও বাতিল/স্থগিত হয়েছে। গার্মেন্টস সেক্টরে প্রায় অর্ধকোটি লোকের কর্মসংস্থান। হঠাত্ করে তারাও বেকার হয়ে পড়েছে। এই বিশাল কর্মিবাহিনীকে কাজ ছাড়া বেতন দেওয়ার সামর্থ্য গার্মেন্টস মালিকদের নেই। তাই সরকার প্রথমেই এই সেক্টরে ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা দিয়েছেন। কৃষির ওপর দেশ দাঁড়িয়ে আছে। কৃষিকে সচল রাখার জন্য এ খাতেও ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা দিয়েছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের জনসংখ্যার একটি বড়ো অংশ যারা দিনমজুর, রিকশাওয়ালা, পরিবহনশ্রমিক, নির্মাণশ্রমিক তাদের অধিকাংশেরই এখন কোনো কাজ নেই, আয় নেই। এই পেশার মানুষের জন্য সরকার কর্তৃক ৭৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিভিন্ন অর্থনৈতিক খাতকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এখন প্রয়োজন সরকারের প্রদত্ত প্রণোদনার সঠিক বাস্তবায়ন এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরাই যেন এই সুবিধা পায়, তা নিশ্চিত করা।

n লেখক : প্রাক্তন অধ্যক্ষ, ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, জাহানাবাদ, খুলনা