কোটি বেকারের দেশে সাহেবদের কেন ধান কাটতে যেতে হলো?

আপডেট : ০৩ মে ২০২০, ২১:৩২

সালেহউদ্দিন

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী দেশে মোট কর্মোপযোগী মানুষের সংখ্যা ১০ কোটি ৯১ লাখ। এর মধ্যে কর্মে নিয়োজিত ৬ কোটি ৮ লাখ মানুষ। বাকি ৪ কোটি ৮২ লাখ ৮০ হাজার মানুষ কর্মক্ষম তবে শ্রমশক্তির বাইরে। অর্থাত্ বেকার। এর বাইরে দেশে দিনমজুর আছেন প্রায় ৬ কোটি। চলমান অঘোষিত লকডাউনের কারণে এদের বড়ো অংশই বর্তমানে বেকার। এই যখন পরিস্থিতি তখন ধান কাটতে শ্রমিকের অভাব কেন পড়ল? কেন টাই-সুট পরা সাহেবদের ধান কাটতে যেতে হলো?

মন্ত্রী, এমপি, ডিসি, এসপি ও শহুরের সাহেবদের কাঁচাপাকা ধান কাটা নিয়ে ইতিমধ্যে নানা মুখরোচক কাহিনির জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে ধান কাটা কি তাদের কাজ? বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড়ো খাত হচ্ছে কৃষি। ২০১৮ সালের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্য মতে, মোট শ্রমশক্তির ৪০.৬ ভাগ কৃষিকাজে নিয়োজিত। দেশের জিডিপিতে কৃষির অবদান ১৫ শতাংশ। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য দূরীকরণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং খাদ্যনিরাপত্তায় এই খাতের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

বাংলাদেশের জনগণের একটা বিশাল অংশ তাদের জীবনধারণের জন্য কৃষির ওপর নির্ভর করে। একসময় ধান বিক্রির টাকায় আমাদের সংসার চলত। লেখাপড়া, জামাকাপড় কেনার পরও বাবা কিছু ধানি জমি কিনতে পারতেন। গ্রামবাংলার প্রত্যেক গৃহস্থ পরিবারই কৃষিজমির ওপর নির্ভরশীল ছিল। অনেক বছর ধরেই  আমাদের এই নির্ভরশীলতা হারিয়ে গেছে। এর মূল কারণ কৃষকের ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া। উত্পাদন খরচের তুলনায় ধানের দাম অনেক কম। আপনাদের কি মনে আছে, গত বছর ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার ক্ষোভে কৃষকরা ধানে আগুন লাগিয়ে বা রাস্তায় ধান ঢেলে দিয়ে নানা অভিনব কায়দায় প্রতিবাদ করেছিলেন?

একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি এক মণ ধানের সমান হলে কি কোনো কৃষক শ্রমিক দিয়ে ধান কাটবে?

যে কারণে খেতে ধান পড়ে থাকছে। কৃষককে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ধীরগতিতে ধান কাটতে দেখা গেছে। দীর্ঘ সময় নেওয়ায় অতিবৃষ্টি এবং অকালবন্যায় কোথাও কোথাও ধান বিনষ্ট। এরপর যতটুকু ধান ঘরে তুলতে পেরেছে তা আবার লোকসান দিয়ে বিক্রি করতে হয় কৃষককে। প্রতি বছর সরকার ধান ক্রয়ের ঘোষণা দেয়, কিন্তু কখনো সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনে না। ধান ক্রয় হয় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ফড়িয়াদের কাছ থেকে। এই যে কৃষকের কাছ থেকে ধান না কেনার যে দুর্নীতি—তার বিরুদ্ধে সরকার কি কখনো কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে? বরং সরকার আমলাতন্ত্রের ফাঁদে পড়ে নিজের কর্তব্য থেকে দূরে থাকে। যেমন ধরুন ধান কেনার সময়ে সরকার ধান কেনে না। সরকার ধান কেনা শুরু করে মৌসুম শুরুর দুই-তিন মাস পর, যখন কৃষকের হাতে ধান থাকে না! সরকার ধানের মূল্য নির্ধারণ করেছে মণপ্রতি ১ হাজার ৪০ টাকা। কিন্তু আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও সংরক্ষণের অভাবে কৃষক মৌসুমের শুরুতে ৬০০-৭০০ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। অনেকেই দেনা করে আবাদ করছেন। দেনা শোধ এবং অভাবের তাড়নায় তাত্ক্ষণিকভাবে ধান বিক্রি করতে হয়। বন্যা, খরা, অনাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ তো আছেই, তার ওপর আছে বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের সংকট এবং কীটনাশক, সার ইত্যাদির চড়া মূল্য। তবে সবকিছু ছাড়িয়ে কৃষকের জন্য সবচেয়ে বড়ো সংকট হয়ে উঠেছে শ্রমিকের মজুরি। কৃষকের উত্পাদন খরচের একটা বড়ো অংশই চলে যায় শ্রমিকের মজুরির পেছনে। একজন শ্রমিকের পেছনে কৃষকের দৈনিক ব্যয় করতে হয় ৪০০-৫০০ টাকা। কিন্তু এ টাকা দেওয়ার সামর্থ্য তার নেই। ফলে দেশে কোটি কোটি বেকার থাকলেও ধান কাটার শ্রমিকের সংকট দেখা দিয়েছে। কৃষক শ্রমিকের মজুরি দিতে চান সে টাকায় শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না।

কৃষক শ্রমিকের চাহিদা মতো মজুরি কোথা থেকে দেবে? সে তো ধানের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না! এক মণ উত্পাদনের যে খরচ তার চেয়ে কয়েক শ টাকা লোকসানে তাকে ধান বিক্রি করতে হয়। এই যে সংকট, এর সমাধান করাই তো সরকারের দায়িত্ব। সুট-টাই পরা সাহেবদের দিয়ে ধান কাটা এ সংকটের সমাধান নয়। সরকারকে একসঙ্গে দুটি কাজ করতে হয়, বাজারে চালের মূল্য কম রাখা এবং কৃষকদের ধানের ন্যায্যমূল্য দেওয়া। এই দুই কাজের সমন্বয় সরকার যেদিন করতে পারবে সেদিন আর ধান কাটার শ্রমিকের অভাব পড়বে না। গ্রামবাংলায়ও ফিরে আসবে নবান্নের উত্সব।

n লেখক :সিনিয়র সাংবাদিক