দিন দিন গৃহশ্রমিক নির্যাতনের ঘটনা বেড়েই চলেছে। এর লাগাম টানতে নীতিমালা প্রণীত হলেও আইনি কাঠামো না থাকায় তা সীমাবদ্ধ কেবলই কাগজে-কলমে। তাই এ সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের তাগিদ দিয়েছেন বিজ্ঞজন।
বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য মতে, ২০১৫-১৯ সালে মোট ১৯৩ জন গৃহশ্রমিক নির্যাতনের শিকার হয়। এ সময় ২৩ জন গৃহশ্রমিককে হত্যা, ৩২ জনকে ধর্ষণ, ৮৪ জনকে গুরুতর শারীরিক নির্যাতন, ৫৪ জন আত্মহত্যা ও রহস্যজনক হত্যার চিত্র পাওয়া যায়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশে ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে নির্যাতনের শিকার হয়ে ১৪৯ জন গৃহশ্রমিক নিহত হয়েছে এবং গুরুতর আহত হয়েছে আরো ১৪৮ জন। হতাহত গৃহশ্রমিকের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। গবেষণা অনুসারে, কেবল ২০১৮ সালেই নির্যাতনের শিকার হয়ে নিহত হয়েছে ১৮ গৃহশ্রমিক এবং গুরুতর আহত হয়েছে আরো ১৮ জন। এছাড়া নির্যাতনের কারণে আত্মহত্যা করেছে আরো চার জন। ২০১৭ সালে নির্যাতনের শিকার হয়ে নিহত হয়েছে ২৭ জন এবং আহত হয়েছে আরো ২৩ জন। ২০১৬ সালে নির্যাতনের শিকার হয়ে নিহত হয়েছে ৩৮ জন এবং আহত হয়েছে ২৩ জন। উল্লেখ্য, এ তথ্য নির্যাতনে নিহত ও গুরুতর আহতদের কিন্তু হরহামেশাই গৃহশ্রমিকদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। তাই প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি বলে মনে করে প্রতিষ্ঠানটি।
এদিকে গৃহশ্রমিক নির্যাতন বন্ধে ২০১৫ সালে করা গৃহশ্রমিক সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি আছে কাগজে-কলমে। পরিবর্তন করতে পারছে না গৃহশ্রমিকের ভাগ্য। আইন করার কথা থাকলেও পাঁচ বছরেও করা হয়ে ওঠেনি গৃহশ্রমিকের রক্ষাকবজ আইন। সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞজন বলছেন, নীতিমালা আইন নয় বলে এটি মানার বাধ্যবাধকতা নেই। নীতি না মানলে শাস্তির বিধানও নেই। তাই অনতিবিলম্বে আইন করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা।
কী আছে নীতিমালায় : শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এই নীতিমালা প্রণয়ন করে। যাতে আছে গৃহকর্মীকে চাকরি থেকে অপসারণ করতে হলে এক মাস আগে তা জানাতে হবে। গৃহকর্মীও যদি চাকরি ছাড়তে চান, তবে নিয়োগকারীকে তা এক মাস আগে জানাতে হবে। তাত্ক্ষণিকভাবে গৃহকর্মীকে চাকরি থেকে বাদ দিলে এক মাসের মজুরি দেওয়ার বিধান করা রয়েছে। গৃহকর্মী অপরাধ করলে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে, তবে নিয়োগকারী নিজে তাকে শারীরিক বা মানসিক শাস্তি দিতে পারবেন না। এছাড়া কোনো গৃহকর্মী যৌন হয়রানি ও নির্যাতন, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করলে সরকার তা পরিচালনা করবে। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের পরিচালক আব্দুছ সহিদ মাহমুদ ইত্তেফাককে বলেন, নীতিমালার আইনি ভিত্তি না থাকায় কেউ তা না মানলে তাকে আইনের আওতায় আনা যায় না। আবার শ্রম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যে তদারকি সেল থাকার কথা ছিল তাও কার্যকর নয়। তাই আমরা একটি আইনি কাঠামোর দাবি করে আসছি।
আইনের সুরক্ষায় এনে গৃহশ্রমিকদের নির্যাতন প্রতিরোধ ও তাদের মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করার সময় এসেছে বলে মনে করেন মানবাধিকারকর্মী ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল। তিনি বলেন, গৃহশ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। দায়িত্ব পালনের জন্য নানা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের অধিকার রক্ষায় গৃহশ্রমিক সুরক্ষা নীতিমালা-২০১৫-এর বাস্তবায়ন করতে হবে। এ বিষয় আলাদা আইনের প্রয়োজন নেই উল্লেখ করে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাল্টিসেক্ট্ররাল প্রকল্প পরিচালক ড. আবুল হোসেন বলেন, মহিলা ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় এখন অপরাধীর বিচার হচ্ছে। এই আইন যথাযথভাবে কার্যকর করতে পারলেই অপরাধ কমে আসবে।
