প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের কারণে সরকারি সাধারণ ছুটি চলছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। তবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ থেকে মাঠে তত্পর পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা। প্রথম থেকেই বিদেশফেরত সন্দেহভাজন করোনা আক্রান্ত রোগী খোঁজা, মানুষকে সচেতন করা, ত্রাণ বিতরণ, বাসায় খাবার পৌঁছে দেওয়াসহ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মারা যাওয়াদের দাফন পর্যন্ত করছেন পুলিশ সদস্যরা। করোনায় মৃতদের পাশে নেই স্বজনরা, আছে পুলিশ। করোনায় এ পর্যন্ত ১৭৭ জন মারা গেছেন। মৃতদের মধ্যে অনেকের বাবা-মা, ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া প্রতিবেশীসহ আত্মীয়স্বজনদের খবর দিয়েও আনা যায়নি। এদের ৯৮ ভাগেরই কবর খোঁড়া, জানাজা ও দাফনের ব্যবস্থা করেছে পুলিশ।
বৈশ্বিক মহামারি করোনার সংক্রমণ বেড়েই চলেছে। করোনায় ফ্রন্টলাইন ফাইটার ডাক্তার ও নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের মতো আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে পুলিশেও। করোনা ভাইরাসের সম্মুখযুদ্ধে থাকা পুলিশ বাহিনীতে দিন দিন করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। সর্বশেষ ৩ মে’র হিসাব অনুযায়ী আক্রান্ত হয়েছেন ৮৫৪ পুলিশ সদস্য। এরই মধ্যে শুধু ডিএমপিতেই ৪৪৯ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়েছেন ১১৩ জন পুলিশ। এ পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন পাঁচ জন সদস্য। এদের মধ্যে দুই জন এসআই, এক জন এএসআই এবং দুই জন কনস্টেবল রয়েছেন। এরা হলেন এসআই সুলতানুল আরেফিন (ডিএমপি, ঢাকা), এসআই নাসির উদ্দিন (স্পেশাল ব্রাঞ্চ, ঢাকা), এএসআই আব্দুল খালেক, কনস্টেবল (ডিএমপি, ঢাকা) আশেক মাহমুদ ও জসিম উদ্দিন (ডিএমপি, ঢাকা)। গতকাল পর্যন্ত সারাদেশে পুলিশের ১ হাজার ২৫০ জন সদস্যকে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। আইসোলেশনে আছেন ৩১৫ জন। করোনায় আক্রান্ত ৫৭ জন পুলিশ সদস্যকে সুস্থ ঘোষণা করা হয়েছে।
তবে করোনায় পাঁচ জন সহকর্মীকে হারিয়েও পুলিশ সদস্যরা থেমে নেই। তারা জনগণের সেবায় এগিয়ে যাচ্ছেন। করোনা যুদ্ধে তারাও ফ্রন্টলাইনের যোদ্ধা। সম্প্রতি ঢাকার বাসাবো এলাকার মো. নাজমুল হুদা নামে এক সাংবাদিক করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এ ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর তিনি যে বাসায় থাকেন সেটি বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করে দিয়েছে এলাকাবাসী। ঘটনা জানতে পেরে গতকাল রবিবার বিকালে পুলিশ গিয়ে তালা খোলার ব্যবস্থা করে বাড়ির মালিক ও স্থানীয়দের মানবিক আচরণ করার কথা বলে এসেছে। ভুক্তভোগী নাজমুল জানান, তার বাসায় বাইরে থেকে তালা মেরে দিয়েছে। দুপুরেও তিনি খেতে পারেননি। ঢাকার একটি গণমাধ্যমে কাজ করা নামজুল বলেন, ‘আমি আমার জন্য বলছি না। আমার মা, ভাইয়া আর বোনের জন্য আমি বলছি। তাদের অন্তত বাঁচান।’ সবুজবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুবুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, ঘটনাটি জানার পরে সেখানে পুলিশের টিম পাঠানো হয়।
পুলিশের আইজি বেনজীর আহমেদ বলেন, করোনাসহ যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় আমরা আছি, আমরা থাকব। দিনমজুরসহ অসহায়দের ত্রাণ কাজে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা। করোনায় মারা যাওয়া অনেকের বেওয়ারিশ লাশ রাস্তায় পড়েছিল। নিজের সন্তান, পিতা-মাতা, ভাইবোন হিসেবে ধরে নিয়ে পুলিশ তাদের দাফন করেছে। যেসব পুলিশ সদস্য মারা গেছেন তাদের রুহের মাগফিরাত এবং আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের সুস্থতার জন্য দেশবাসীর দোয়া কামনা করে বেনজীর আহমেদ বলেন, করোনা যুদ্ধে আমরা পিছপা হব না। সবার স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার অনুরোধ জানান তিনি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনা সংকটের প্রথম থেকেই বিদেশফেরতদের অবস্থান শনাক্ত করে কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করা, আক্রান্তদের হাসপাতালে পাঠানো, লকডাউন নিশ্চিত করা, ত্রাণ বিতরণ, সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা থেকে শুরু করে করোনায় মৃত ব্যক্তিদের দাফনসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি ধান কাটতে কৃষকের বা শ্রমিকের জোগান দেওয়া, চাষির সবজি বিক্রির বন্দোবস্ত করতেও মানবিক সহায়তায় এগিয়ে এসেছে পুলিশ। ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে নানা কর্মকাণ্ডের জন্য পুলিশ সদস্যদের সরাসরি জনসাধারণ এবং আক্রান্তদের সংস্পর্শে যেতে হচ্ছে। ফলে নিজেদের মধ্যেও করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে।
পুলিশের কর্মকর্তারা বলেন, পুলিশের ট্রেনিং নেই, তবু করোনাযুদ্ধে মাঠে আছে। স্বাভাবিকভাবে পুলিশের এই সময়ের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব গণজমায়েতে বাধা ও সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা। আর সেই কাজটি করতে গিয়ে বাইরে ডিউটির সময় পুলিশ সদস্যরা আক্রান্ত হচ্ছেন।
রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, করোনায় আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের বেশির ভাগের শরীরে এই রোগের কোনো উপসর্গ দেখা যাচ্ছে না। কয়েক জনের সামান্য জ্বর থাকলেও বেশির ভাগই সুস্থ মানুষের মতো। আবার ভর্তির পর ছয়-সাত দিনের মধ্যে অনেকে সুস্থ হচ্ছেন। করোনায় মাঠপর্যায়ে ডিউটি করেন এমন সদস্য ও বিশেষ করে পুলিশের কনস্টেবল পদমর্যাদার সদস্যরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
ডিএমপির পুলিশ অর্ডার ম্যানেজমেন্ট (পিওএম) দক্ষিণের এক কর্মকর্তা বলেন, করোনা সংকটের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত কনস্টেবলরা। আক্রান্ত মৃতের সত্কার, আক্রান্তের পর পালালেও সেই রোগীকে ধরে আনা, আক্রান্তের বাসা বা ভবন লকডাউনে সরাসরি কনস্টেবলদের উপস্থিতিই বেশি। প্রতিনিয়ত করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে যাওয়ায় তাদের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এ অবস্থায় কনস্টেবলদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা দরকার। তিনি বলেন, পেট্রল ডিউটি, চেকপোস্ট কিংবা ট্রাফিক সিগন্যালেও দায়িত্ব পালনকারী বেশির ভাগ সদস্য পুলিশ ব্যারাকে থাকেন, যেখানে একটি রুমে অন্তত ১২ জন সদস্য বসবাস করেন। এটা তাদের আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম বড়ো কারণ।
ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের চিকিত্সাসেবার সার্বক্ষণিক মনিটর করা হচ্ছে। তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য কাঁচাবাজারসহ সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে। যারা মারা গেছে, তাদের পরিবারের জন্য আর্থিক সহযোগিতা প্রদানসহ সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হয়েছে। করোনায় পাঁচ জন সদস্য মৃত্যু ও গতকাল পর্যন্ত ডিএমপির ৪৪৯ জন সদস্য আক্রান্ত হওয়ার পরও কোনো পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালনে পিছু হটেননি। তারা বীরদর্পে রাজধানীবাসীর নিরাপত্তা প্রদান ও করোনাযুদ্ধে ফ্রন্টলাইনে থেকে বিরতিহীনভাবে ত্রাণসহ সব ধরনের সহযোহিতা করে যাচ্ছে। তবে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য নগরবাসীর কাছে তিনি সহযোগিতা কামনা করেছেন।
