লকডাউনে বিশ্ব অর্থনীতি ও বাংলাদেশ

আপডেট : ০৪ মে ২০২০, ২১:৪৭

বিশ্বের অগ্রসর, উদীয়মান এবং উন্নয়নশীল দেশসমূহের বাজার অর্থনীতি বিশ্বব্যাপী লকডাউনের কারণে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হইয়াছে। তছনছ হইয়া গিয়াছে উন্নত বিশ্বের অর্থনৈতিক গতি-প্রকৃতি। এই মন্দা বিশ্বকে কতটা ভোগাইবে, কতটা কাটাইয়া উঠা যাইবে তাহা লইয়া বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতি জরিপকারী প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন দেশের রিজার্ভ বিশেষজ্ঞরা নানা ধরনের আশঙ্কা ও আশার কথা শুনাইতেছেন। তবে একের সঙ্গে আরেক পক্ষ একমত হইতে পারিতেছেন না। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলিতেছে, এই মন্দা ১৯২৯-৩৩ সালের এবং ২০০৭-৮ সালের মন্দাকেও অতিক্রম করিবে। কিন্তু এই লকডাউনের ক্ষতি আংশিকভাবে কাটাইয়া উঠা যাইবে আগামী বত্সরের মধ্যে। বৈশ্বিক অর্থনীতি ক্রমান্বয়ে ৩.০-তে নামিয়া আসিবে, যাহা আগামী বত্সরের শেষে পুনরায় ৫.৮-এ পৌঁছাইবে। গোটা বিশ্বকে ৯ ট্রিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ ক্ষতির সম্মুখীন হইতে হইবে, যাহা বিশ্বের তৃতীয় ও চতুর্থ বৃহত্ অর্থনীতির দেশ জাপান ও জার্মানির ইকোনমির সমান। ঐদিকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) বলিতেছে, বৈশ্বিক অর্থনীতি ১৩ হইতে ৩২ শতাংশ পর্যন্ত সংকুচিত হইবে, যাহা পৃথিবীর সকল দেশকেই ভুগিতে হইবে। ইহা পুনরুদ্ধারে কত দিন সময় লাগিবে তাহা নির্ভর করিতেছে করোনা ভাইরাসের সঙ্গে কত দিন লড়াই করিতে হয় এবং সরকারগুলি কীভাবে পরিকল্পনা সাজায় তাহার উপর। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও বলিতেছে, ৩৩০ কোটি মানুষ, অর্থাত্ বিশ্বের শ্রমশক্তির ৮১ ভাগ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে করোনা লকডাউনের ক্ষতির সম্মুখীন হইয়াছে। অন্যদিকে আরো ভয়ানক কথা শুনাইয়াছে অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট। তাহারা বলিয়াছে, যদি দেশসমূহ সকল সিদ্ধান্ত সঠিকভাবে গ্রহণ করে এবং এক বত্সর পর্যন্ত ভাইরাসজনিত কারণে ভুগিতে হয়, তাহা হইলে বিশ্ব অর্থনীতির চেহারা হয়তো আর কখনোই পূর্বের অবস্থায় ফিরিবে না। তাহারা হিসাব করিতেছেন, উন্নয়নশীল দেশসমূহের পণ্যমূল্য বাড়িবে, অর্থপ্রবাহ মন্থর হইয়া আসিবে, বহির্বিশ্ব হইতে চাহিদাপত্র কমিয়া যাইবে এবং চিকিত্সা-সংকট দেখা দিবে।

এই প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক মন্দার বাতাস বাংলাদেশকেও ছাড়িবে না, তাহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা প্রত্যাশা করিয়াছিল, ২০২১ সাল নাগাদ বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হইবে ৯.৫ শতাংশ। কিন্তু তাহা আর কোনোক্রমেই ধরিয়া রাখা যাইবে না। বরং এক হিসাবে দেখা যায়, ঠিক বর্তমান সময়ে ২.২ শতাংশে নামিয়া আসিয়াছে। নিঃসন্দেহে প্রবৃদ্ধির এই হার দীর্ঘ সময় অব্যাহত থাকিলে আমাদেরও কঠিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হইতে হইবে। তবে ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স এবং যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দি ইকোনমিস্ট বলিতেছে, বহু প্রতিবেশী দেশের চাইতে বাংলাদেশের অর্থনীতি কম ক্ষতিগ্রস্ত হইবে। তাহাদের ভাষ্য, মহামারি পরিস্থিতিতে উদীয়মান যেই ৬৬টি দেশ অপেক্ষাকৃত সবল থাকিবে সেইখানে বাংলাদেশ রহিয়াছে নবম স্থানে। স্থানীয় অর্থনীতিবিদের অনেকেই বলিতেছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি মুখ্যত নির্ভরশীল কৃষি, সেবা ও শিল্পের উপর। এই তিন ক্ষেত্রে করোনার প্রভাব কম পড়িবে। কিন্তু এই আত্মতুষ্টিতে ভুগিলে চলিবে না। কারণ তৈরি পোশাক ও প্রবাসী আয় আমাদের অর্থনীতিতে যে বিশাল ভূমিকা রাখে তাহা বাধাগ্রস্ত হইলে বা মন্থর হইয়া পড়িলে বড়ো মুশকিলে পড়িতে হইবে।