ডা. মো. আসাফুজ্জোহা রাজ
বিশ্ব এখন করোনার কাছে জিম্মি। সমগ্র বিশ্ব যেন অসহায়। সামান্য অসতর্কতাতেই যেন রক্ষা নেই। মাত্র পাঁচ মাসে জন্ম নেওয়া এই ভাইরাস সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের চরিত্রের পরিবর্তন করছে, ফলে গবেষকদের অনেকটা গোলকধাঁধার মধ্যে ফেলে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চালিয়ে যাচ্ছে প্রলয় ধ্বংসলীলা। ইতালির এক স্বনামধন্য চিকিত্সকের অসহায়ত্ব স্বীকার উক্তি, ‘কোনো কিছুই যেন যথেষ্ট নয়।’
কীভাবে ছড়ায় :অনেক গবেষকই নিশ্চিত যে করোনা ভাইরাস সরাসরি আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে ছড়াচ্ছে, সংস্পর্শ মানে সরাসরি ছোঁয়ার বাইরেও তার ব্যবহূত কিছু ছোঁয়া, তার স্পর্শের কিছু ধরা সেটা হতে পারে সিঁড়ির রেলিং, লিফটের সুইচ, রিকশা, গণপরিবহন, প্লাস্টিকের শপিং ব্যাগ বা যে কোনো কিছু, তার হাঁচি বা কাশির ছয় ফুটের মধ্যে থাকা বা হাঁচি ও কাশির পরক্ষণেই ঐ স্থানে প্রবেশ করা, তার কাশি, লালা বা সর্দি কোনোভাবে শরীরের কোথাও লাগা, সেটা সরাসরি হোক বা যে কোনো নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ওপরে জমে থাকা অবস্থা থেকে হোক, লালা বা কাশি পড়ে থাকলে সেটা পায়ে লেগে বা জুতাতে লাগলে পরবর্তী সময়ে শরীরের কোথাও লাগা ও সেখান থেকে মুখ, নাক বা চোখের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করা।
কিছু গবেষণা বলছে হাঁচি থেকে ভাইরাসটি নিচে পড়ার আগে কিছু সময় বাতাসে থাকতে পারে, ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন পদার্থের ওপর তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বুঝে বেশ কিছু সময় বিশেষ করে প্লাস্টিকের পৃষ্ঠে প্রায় ৭২ ঘণ্টাও থাকতে পারে। এত কিছুর মধ্যেও স্বস্তির বিষয়, সাধারণত এ ভাইরাস চামড়া ভেদ করে ঢুকতে পারে না; সরাসরি কাশি, হাঁচি, সর্দি বা লালার মাধ্যমে অথবা হাত কিংবা যে কোনো মাধ্যম থেকে ভাইরাসটি মুখ, নাক বা চোখের মধ্য দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে। কানের মধ্যে দিয়েও ঢোকার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কেউ জানে না, কোন ব্যক্তির মধ্যে ঢুকে আছে এ ভাইরাস। অনেক সময় শরীরের রোগপ্রতিরোধক্ষমতা মজবুত থাকলে উপসর্গ ছাড়াই শরীরে বাস করতে পারে কোভিড-১৯। সুতরাং এখন সবাইকেই কোভিড-১৯-এর মতো মনে করতে হবে, এ এক নির্মম নিষ্ঠুরতা।
যা করণীয় :আসলে নতুন এই ভাইরাস মোকাবিলায় প্রকৃতপক্ষে কী করা উচিত সেটার নির্দিষ্ট গাইডলাইন দিতে হিমশিম খাচ্ছে সমগ্র বিশ্বের বিশেষজ্ঞগণ। এ রোগের কোনো ওষুধ বা প্রতিষেধক এখনো নির্ভরযোগ্য সংস্থা থেকে পাওয়া যায়নি, তাই কেবল সঠিক জ্ঞানে সতর্ক হওয়াটাই একমাত্র মুক্তির পথ। বারবার বলা হচ্ছে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে, নিজ ঘরের সীমানা পার হওয়াই এখন বিপজ্জনক, কারণ কোনো অবস্থাতেই আক্রান্ত ব্যক্তির সীমানার মধ্যে পড়া যাবে না, আর কারো পক্ষেই জানা সম্ভব নয় কে বহন করছে এ ভাইরাস।
এত কিছু জানার পরে আমরা দেখছি অতি প্রয়োজন ছাড়া মানুষ মিথ্যার আশ্রয়ে বা কোনো অজুহাতে বাইরে বের হওয়ার দুঃসাহস দেখাচ্ছে, যেটা অনেকটাই আত্মহননের শামিল।
আবহাওয়া পরিবর্তনের এ সময়ে ঠান্ডা জ্বর বা কাশি হতেই পারে। আতঙ্কিত না হয়ে পরিচিত কোনো চিকিত্সকের টেলিপরামর্শ নিতে পারেন, এ মুহূর্তে টেলিমেডিসিনের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, রাষ্ট্রীয়ভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার পাশাপাশি বিভিন্ন চিকিত্সা সেবাদানকারী সংগঠন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ দৈনিক সংবাদপত্রে টেলিপরামর্শের নম্ব্বর দিচ্ছে, যেমন ডেন্টাল সমস্যা সমাধানে বিএফডিএস। একান্ত না পারলে বয়স ও শারীরিক অবস্থা বিচার করে জ্বরে প্যারাসিটামলের সঙ্গে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা থাকলে ওমিপ্রাজল খেতে পারেন, কাশি বা গলায় ব্যথা হলে গরম পানিতে লবণ মিশিয়ে কুলি করার সঙ্গে অ্যান্টি হিস্টামিন খাওয়া যেতে পারে, আর নিজেকে পরিবারের বাকি সদস্যদের থেকে যথাসম্ভব আলাদা রাখার চেষ্টা করতে হবে। নিয়ন্ত্রণ না হলে অবশ্যই চিকিত্সাকেন্দ্রের পরামর্শ নিতে হবে, এখন একাধিক চিকিত্সাকেন্দ্রে কোভিড-১৯ সেবা চালু হয়েছে, কাছের কেন্দ্রটির নম্ব্বর সংরক্ষণ করে রাখুন।
আতঙ্কের কিছু নেই, গুজবে কান দিয়ে মানসিকভাবে দুর্বল বা হতাশাগ্রস্ত হওয়া চলবে না, নির্ভরযোগ্য সূত্রে সঠিক জ্ঞানে সতর্ক হতে হবে, সতর্কতার মাধ্যমেই এ দুর্যোগ মোকাবিলা সম্ভব, মনে রাখতে হবে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা হতাশা আমাদের রোগপ্রতিরোধক্ষমতাকে কমিয়ে দেয়, আর কেউ পূর্ণ সতর্ক থাকলে আর ভয় কীসের। তাই নিজেকে প্রফুল্ল রাখতে হবে, সৃষ্টিকর্তার কাছে সাহায্য চাইতে হবে। মহান আল্লাহ আমাদের এই করোনা দুর্যোগ মোকাবিলায় জয়ী করুন।
n লেখক :রাজ ডেন্টাল সেন্টার, কলাবাগান ও সদস্য সচিব, বিএফ ডিএস
