আব্দুল্লাহ আল মাছুম
যখন বিশ্ব করোনা-পরবর্তী উত্পাদন নিয়ে ভাবছে তখন সরবরাহ-শৃঙ্খল ভেঙে পড়ায় অনেক দেশে উত্পাদিত শস্য সংরক্ষণাগারের অভাবে নষ্ট হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী লক ডাউনের কারণে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া, বাজারব্যবস্থা ভেঙে পড়া ও অতি সাবধানতাবশত বিভিন্ন স্থানে কাঁচা শস্য খাদ্যতালিকা থেকে বাদ দেওয়ায় সাময়িক চাহিদা অস্বাভাবিক হারে কমে গেছে। পশ্চিম ভারতের কৃষকরা তাদের উত্পাদিত আইসবার্গ লেটুস ও স্ট্রবেরির মতো শস্য বিক্রি করতে না পেরে গবাদি পশুকে খাইয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে।
আমাদের দেশের খাদ্যনিরাপত্তার বড়ো অংশ বোরো ধানের ওপর নির্ভর করে। করোনার প্রকোপে নির্বিঘ্নভাবে বোরো ফসল ঘরে তোলতে পারবে। সীমিত উত্পাদন বর্তমানে প্রভাব না ফেললেও করোনা-পরবর্তী চাহিদা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। আমাদের কৃষিব্যবস্থার অন্যতম দুর্বল দিক হচ্ছে সংরক্ষণাগারের অভাব। তাই উত্পাদনের তারতম্য সমন্বয়ের তেমন কোনো সুযোগ নেই।
কৃষিপ্রধান দেশ হলেও বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা বৈশ্বিক কৃষি ও খাদ্যসরবরাহ-শৃঙ্খলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। করোনার কারণে বিশ্ব থমকে রয়েছে। বিশ্বের কোটি কোটি কৃষক মাঠে কাজ করতে পারছেন না। বীজ উত্পাদন ও সরবরাহ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফসল রোপণ ব্যবস্থা হুমকিতে পড়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। অপরদিকে ফসল উত্তোলনের জন্য কৃষিশ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় তরমুজ ও ব্লুবেরি খেতেই পচে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শ্রমিকসংকটের কারণে ইউরোপের সবজি খামারিরাও আবাদ নিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন পার করছে। একই অবস্থা স্পেন ও ইতালিতে। ইতালির কৃষি খাতে আগামী দুই মাসে ২ লাখ মৌসুমি শ্রমিকের প্রয়োজন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে এবারের মৌসুম বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে তৃতীয় চাল রপ্তানিকারক দেশ ভিয়েতনাম, নবম গম রপ্তানিকারক কাজাখস্তান খাদ্যশস্য রপ্তানি সীমিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। অভ্যন্তরীণ জোগানের কথা চিন্তা করে এই সতর্কতামূলক পদক্ষেপ। রাশিয়ার ভেজিটেবল অয়েল ইউনিয়ন সূর্যমুখীর বীজ রপ্তানি সীমিত করার আহ্বান জানিয়েছে। পাম তেল উত্পাদনে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা মালয়েশিয়ায় তেলের উত্পাদন কমে গিয়েছে। লক ডাউনে যাওয়ায় ভারতের সরবরাহব্যবস্থা স্থবির হয়ে রয়েছে। থাইল্যান্ডও একই পদক্ষেপ ঘোষণা করতে পারে। এরই মধ্যে পঙ্গপালের আক্রমণে বিশ্বের অনেক অঞ্চলে কৃষির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। নতুন নতুন অঞ্চলে পঙ্গপালের আক্রমণের আশঙ্কাও রয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের মৌসুম ঘনিয়ে আসছে। বলা তো যায় না করোনার ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে কখন যে বড়ো ধরনের ঝড় বা জলোচ্ছ্বাস কৃষিভিত্তিক গরিব দেশগুলোকে লন্ডভন্ড করে দিয়ে যায়। বৈশ্বিক উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ায় খরা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে স্থলভাগ বিলীন হওয়া পুরো বিশ্বের কাছেই মূর্তিমান আতঙ্ক। জলবায়ু পরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক নদীর পানির ন্যায্য হিস্যাবঞ্চিত হওয়ায় বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের কৃষি উর্বরতাও নষ্ট হচ্ছে। সব মিলিয়ে বিশ্ব অস্থিরতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই অস্থিরতায় আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম বাড়তে শুরু করেছে। অদূর ভবিষ্যতে নানামুখী সংকটে ২০০৮ সালের খাদ্যসংকটের মাত্রাও ছাড়িয়ে যেতে পারে। যার প্রাথমিক শিকার হবে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলো।
টালমাটাল পরিস্থিতিতে সত্যিই বড়ো ধরনের খাদ্যসংকটের কবলে পড়লে আন্তর্জাতিক সাহায্যের তেমন আশা নেই। বরং দুষ্টু কূটকচালের শিকার হওয়ার শঙ্কা প্রবল। তাই করোনা-পরবর্তী বেঁচে থাকাকে প্রাধান্য দিয়ে দেশের নীতিনির্ধারকদের সুদূরপ্রসারী কর্মতত্পরতা চালাতে হবে। বিদেশি সাহায্যের ভূত মাথা থেকে ফেলে দিয়ে যে কোনো মূল্যে দেশের কৃষি উত্পাদন বাড়াতে হবে। কারণ আরেকটি দুর্ভিক্ষের বোঝা বাংলাদেশ সইতে পারবে না।
লেখক :সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
