নতুন করোনা ভাইরাসের (কোভিড-১৯) বিস্তার ঠেকাতে দেশে দেশে চলছে লকডাউন, কারফিউ আর জরুরি অবস্থা। সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে মানুষকে ঘরে থাকতে বলায় থমকে গেছে যানবাহন ও কলকারখানার চাকা। স্থবির হয়ে পড়েছে অর্থনীতিও। এ অবস্থায় দেশে দেশে চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন কোটি কোটি মানুষ। করোনা ভাইরাসজনিত উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রে চাকরি হারিয়েছেন ৩ কোটির বেশি মানুষ। এই সংখ্যা আরো বাড়ছে। বলা হচ্ছে, ১৯৩০ দশকের মহামন্দার পর যুক্তরাষ্ট্রে মানুষের চাকরি হারানোর সবচেয়ে খারাপ সময় এটি। এদিকে কঠিন সময়ে মানুষের চাকরি ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সরকার। খবর:সিএনএন ও দ্য গার্ডিয়ানের।
করোনা সংকট মোকাবিলায় ট্রাম্প প্রশাসন এখন পর্যন্ত প্রায় আড়াই লাখ কোটি ডলার (প্রায় ২১২ লাখ কোটি টাকা) প্রণোদনা প্যাকেজ ছাড় করেছে। এর বড়ো একটি অংশ ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে। যাতে তারা কর্মীদের বেতন দিতে পারে। কিন্তু তার পরও বেকারত্বের হার ঠেকানো যাচ্ছে না। শুক্রবার প্রকাশ করা যুক্তরাষ্ট্রের চাকরির পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত মার্চের মাঝামাঝি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ৩ কোটির বেশি মার্কিনি বেকার ভাতা-সুবিধার জন্য সরকারের কাছে আবেদন করেছেন।
বলা হচ্ছে, দেশ জুড়ে অচলাবস্থার কারণে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান লে-অফ করতে বাধ্য হয়েছে অথবা কর্মীদের ছুটিতে পাঠিয়েছে। এই সংকটের সমাধান খুঁজতে মরিয়া হয়ে কাজ করছেন মার্কিন অর্থনীতিবিদ ও বিনিয়োগকারীরা। ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই বেকারত্ব দীর্ঘ সময় ধরে থাকবে। কারণ ঘরে থাকার বিধিনিষেধ উঠে গেলেও অর্থনৈতিক অবস্থা পুনরুদ্ধারে আরো অনেক সময় লেগে যাবে। ডয়চে ব্যাংক সিকিউরিটিজের প্রধান অর্থনীতিবিদ টরস্টেন স্লোক বলেন, ‘আমরা লিফটে উঠছি আর এসকেলেটরে নিচে নামছি’।
তবে আশার কথা বলেছেন ক্যাপিটাল ইকোনকিমসের শীর্ষ মার্কিন অর্থনীতিবিদ অ্যান্ড্রু হান্টার। তার মতে, লে-অফের কারণে বেশির ভাগ কর্মী সাময়িকভাবে বেকার হয়েছে। তারা স্থায়ীভাবে চাকরি হারাননি। সংকট কাটলে তাদের আবার কাজে যোগ দেওয়ার বড়ো সুযোগ রয়েছে। ক্যাপিটাল ইকোনমিস বলছে, বর্তমানে বেকারত্ব ২০ শতাংশের কাছাকাছি হলেও বছর শেষে তা ১০ শতাংশের নিচে নেমে আসবে। তবে টরস্টেন স্লোকের মতে, ১০ শতাংশ বেকারত্বও অনেক বেশি। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রে গত ৫০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন বেকারত্ব ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছিল।
খবরে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অঙ্গরাজ্যগুলোকে ধীরে ধীরে ঘরে থাকার বিধিনিষেধ তুলে দিতে বলেছেন। কিছু রাজ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলতে শুরু করেছে। সেখানকার অনেক প্রতিষ্ঠান জানাচ্ছে, চাকরির জন্য বিপুলসংখ্যক আবেদন তাদের কাছে জমা পড়েছে। ইতিমধ্যে বেশ কিছু বৃহত্ মার্কিন কোম্পানি কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে। কিছু কোম্পানি জানিয়েছে, তারা লে-অফের পরিকল্পনা করছে। বোয়িং জানিয়েছে, তারা ১৬ হাজার কর্মীকে লে-অফে পাঠানোর চিন্তাভাবনা করছে। যা তাদের মোট কর্মীর প্রায় ১০ শতাংশ।
গত মঙ্গলবার মার্কিন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ৪ দশমিক ৮ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। যা ২০০৯-এর মন্দার পর সবচেয়ে বেশি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জ্যেষ্ঠ অর্থ উপদেষ্টা কেভিন হ্যাসেট সতর্ক করে বলেছেন, চাকরি হারানোর হার জুন মাস নাগাদ ২০ শতাংশ হতে পারে।
এদিকে করোনার কারণে বিপর্যস্থ ইউরোপের অর্থনীতিও। ইউরোপের শীর্ষ অর্থনীতির দেশ জার্মানি, ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেন করোনার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। লকডাউন ও মানুষের চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় এসব দেশে বেকারত্ব বেড়েই চলেছে। তবে বিভিন্ন দেশের সরকার চাকরিচ্যুতি ঠেকাতে যথাসাধ্য চেষ্টা করে চলেছে।
ওয়াশিংটন পোস্টের এক খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ৪ দশমিক ৮ শতাংশ সংকুচিত হলেও ইউরোপের অর্থনীতি সংকুচিত হয়েছে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। কর্মীদের চাকরি বাঁচাতেও যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইউরোপ বেশি সফল হয়েছে। কারণে ইউরোপের অনেক সরকার বেতন ভর্তুকি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মহাপরিচালক গাই রাইডার বলেন, করোনার কারণে লকডাউন হচ্ছে একের পর এক দেশ। ফলে বন্ধ হচ্ছে, সব ধরনের ব্যবসা। বিশ্ব জুড়ে দৈনিক প্রতি পাঁচ জনের চার জনই চাকরি হারানোর তালিকায় যুক্ত হচ্ছে। আইএলও সতর্ক করে বলেছে, করোনার কারণে বিশ্বের কর্মক্ষম মানুষের অর্ধেক বেকার হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংকট মোকাবিলায় বিশ্বকে এক হয়ে দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।
