মেঘ নেই। ভার নেই। ঝকঝকে নির্মল আকাশ। শেষ কার্তিকের মিষ্টি সকাল। জানালার ফাঁক দিয়ে মৃদু হাওয়া ঢুকছে। গায়ে বসে কচি কচি রোদেরা নাচছে। দেহমনে বইছে হঠাত্ প্রেমের উষ্ণতার মতো কী আরাম, কী আরাম আমেজ। দু’চোখ বন্ধ করে প্রকৃতির স্নিগ্ধতা আর ঋতুবদলের সংকেতে আমি মগ্ন। বিমুগ্ধ।
আচমকা দরজা খুলে, নিঃশব্দে ঘরে ঢুকলেন মায়ের মতো পবিত্র মহিলা। আমার নিভাঁজ কপালে ঈষত্ টাকঢাকা মাথায় তার করস্পর্শ—ওঠো দশটা বাজল, অফিসে যাবে না। লিখতে বসবে না। বলেই তিনি নাকের ডগা টিপে দিয়ে গালে ঘুম ভাঙানিয়া বিরামহীন বসন্তের আমেজ এঁকে দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। মুদিত চোখ দুটি খুলে গেল, খুলতেই দেখি, পাশের টেবিলে স্তরে স্তরে দিনের সব কাগজ সাজানো। প্রথম পাতায় বড়ো বড়ো হরফের শিরোনাম। প্রায় প্রতিটি খবরেই চারপাশের নেতি, দুর্নীতি আর রাজনীতির ছড়াছড়ি। ভাল্লাগছে না, পড়তে ইচ্ছে করছে না, তবু পড়ছি, বাধ্য হয়ে এক খবর থেকে আরেক খবরে ঢুকে পড়ছি, ঢুকতে ঢুকতে প্রশ্ন জাগছে—ধর্ষণ, উগ্র বাক্যবর্ষণ, ছিনতাই, রথের চাকায় পিষে মারার হুমকি, বিস্ফোরণ, বিকারের উদ্গীরণ, হত্যা, আত্মহত্যা ছাড়া কি কিছুই ঘটছে না? কোথাও কি আলো নেই? মরসুমি সুন্দরের ছায়া নেই! নবজাতকের মুখরিত হাসি নেই? সংবাদপত্রের ছত্রে ছত্রে কেন এত তাণ্ডবের নৃত্য? ধ্বংস আর সর্বনাশা বিকৃতির পূর্বাভাস? না দিয়ে শুরু কেন আমাদের সমস্ত কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতি? এসব ক্ষুদ্রতা ও নেতির বিরুদ্ধে জাগতিক জেদ, মানবিক প্রত্যয়, সম্মিলিত প্রয়াসের ভাষ্য কোথায়? কোথায় সংঘবদ্ধ বীজতলার, বীজবপনের উচ্ছ্বাসের ছায়া-প্রতিচ্ছায়ার চালচিত্র? অন্ধতা, মূঢ়তা, অবদমিত বিকৃতিকেই কি কেবল গুরুত্ব দেবে যাপনের মুখপত্র— যার অন্য নাম সংবাদমাধ্যম!
এই যে, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার নামখানায় একসঙ্গে চার শিশুর জন্ম দিয়ে আপ্লুত এক জননী; এই যে উত্তর চব্বিশ পরগনার প্রত্যন্ত গ্রামের এক সিঙ্গল মাদার দুর্বিষহ স্মৃতি অতিক্রম করে মেয়েকে মানুষের মতো মানুষ করার প্রতিজ্ঞা নিয়ে দিন-রাত গা-গতরে খাটছেন; এই যে ক্যান্সার প্রতিরোধের ভ্যাকসিন আবিষ্কারের সম্ভাবনার কথা বললেন, কলকাতায় নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী হেরাল্ড ই ভার্মাস; আবেগের নকশিকাঁথা বুনে বাংলার রাজনীতিতে শেষ হলো অষ্টম বাংলাদেশ বইমেলা; সম্প্রদায়িকতা নয়, সম্প্রীতিই ভারতের ঐতিহ্য—একথা বললেন একজন মওলানা, ছটপূজোয় চক্ররেল পরিষেবা বাড়িয়ে দেবার আশ্বাস; দেশি মাগুর চাষে হলদিয়ার মত্স্য দপ্তরের অভিনব উদ্যোগ; নাগরিকপঞ্জির নৈরাজ্য আর বিভাজনের দূষিত কর্ষণের বিরুদ্ধে কবি-সাহিত্যিকদের সর্বাত্মক লড়াইয়ের সরব অঙ্গভঙ্গি; চার বছরের নির্বাসন কাটিয়ে দুই দেশের সদিচ্ছায় দেশে ফিরছে ঢাকার সামিরুজ্জামান; এই যে জাতীয় সদ্ভাব দিয়ে বিভেদকামীদের রথযাত্রা রুখে দেবার সংযত প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করলেন মন্ত্রী জাকির হোসেন, এরকম অসংখ্য চিত্তজয়ী খবর—এবং বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনের মনোনয়নে তারুণ্যকে উঁচিয়ে ধরার সম্ভাবনা আর বাঙালির ঐক্যের সত্যকে, নিহিত সত্যের প্রতিশ্রুতিকে জড়িয়ে এক মানুষের সাধনার ইচ্ছাকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেবার মুহুর্মুহু ঘোষণা আমরা শুনতে পাচ্ছি—দুই বঙ্গের নেত্রীকণ্ঠে—প্রতিস্পর্ধী ভাবাবেগে, আচরণে—এসব, এইসব অভিমুখ কি নেতিবাদের নির্বোধ, আত্মঘাতী, ধ্বংসকামী ষড়যন্ত্রী ছকের চেয়ে, খবরাখবরের চেয়ে, বহু বেশি বলবান ও খরস্রোতা নয়?
এরকম সংবাদ কেন কাগজের প্রথম পাতায় নাচবে না? এদের মুখের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় আলোর উজ্জ্বলতাকে ঢেকে দেবে বীভত্স-কদর্যের, দাঁতাল মাতব্বরদের, জনবিচ্ছিন্ন শক্তিবর্গের ক্ষমতা মত্ততার হুঙ্কার আর হুমকির পরিণতি? এদের সঙ্গে নৃত্যরত প্রকৃতি, প্রকৃতির ছত্রচ্ছায়ায় লালিত মানুষের মঙ্গলবোধ ও শুভবুদ্ধির যোগ কোথায়? যার ইঙ্গিতে আমরা বেঁচে থাকি, মৃত্যুকে হার মানাই, যুদ্ধ সংঘাত সংঘর্ষকে ঘৃণা করি, অতীতের স্বাস্থ্যবান মুখ আর মুহূর্তকে বার বার স্মরণ করি, উত্সবে মেতে উঠি—নাচতে থাকি নব আনন্দের সর্বময় ইঙ্গিতে, ছবি লিখি কবিতা আঁকি, নৃত্যের তালে তালে গান শিখি, ছড়িয়ে দিই সংগীতের ঝঙ্কার, সীমাবদ্ধ পরিসর থেকে বেরিয়ে খোলা প্রাঙ্গণের বিমুক্ত প্রান্তরে চলচ্চিত্র উত্সবে ডেকে আনি সব ভাষার, সব দেশের সিনেমাকে, এটাই তো বাঙালির অভিপ্রেত আকাঙ্ক্ষা। এটাই তো তার মনন আর বিশ্বময়তার, কখনো নিভৃত, কখনো দৃপ্ত, স্বতঃস্ফূর্ত উদযাপনের যাপিত, বাঞ্ছিত উচ্চারণের একাগ্র স্বপ্ন। এখানে যে হাত দেয়, তার মুখ পোড়ে, ঘর পোড়ে, পুড়ে যায় তার পূজিত রাষ্ট্রনীতি ও রাজনীতির সমস্ত কৌশল। কেননা এই কৌশলের ভিত নেই। খুঁটি নেই। শূন্যে, বিভ্রান্তি আর সংশয়ে বিদ্বেষ আর অবিশ্বাসের গুজব তৈরি করে রটনা আর রঞ্জিত অতিরঞ্জিত খোয়াবের ওপর ভর দিয়ে উড়ছে। এসব গুজবে ঘা পড়লেই ধপাস। এদের পরিণতি অপরিহার্য। তেমনি অনিবার্য বিদেশ থেকে আগত, সব অর্থে বহিরাগত ভুঁইফোড় আগাছার কষ্টকল্পিত স্বপ্নের মৃত্যু। এসবের উত্খাত নিয়ে আমরা নিশ্চিত।
এরকম নিশ্চয়তার, সুদৃঢ় বিশ্বাসের কারণ কী? নিছক আশাবাদ? না। বিলকুল না। বাংলার মাটি, বাংলার বায়ু, বাংলার জল আর জন, বাঙালির রদবদলে, স্বাতন্ত্র্যের নির্মাণে, তার সুস্থ ভাবনা আর মনন কর্মে বাঙালিকে যুগযুগ ধরে শিক্ষা দিয়েছে—উদার হও, আকাশের দিকে তাকাও, ক্ষুদ্রতা পেরিয়ে সকলের ভাষা, সকলের সংস্কৃতি, সকলের ধর্মকে বরণ করে হরণ করো চিত্রের কৃত্রিম সীমান্ত। বাঙালির নাগরিক অভ্যাস, লোকায়ত বিষয়-আশয়ের সচেতন ও অবচেতন অনুশীলন তাকে নিজেকে চিনবার, মানুষকে জানবার আদেশ দিয়ে বলেছে, বিশ্বমানব হবি যদি, কায়মনে বাঙালি হ। (গুরুসদয় দত্ত)। তার বাঙালিয়ানা তার স্বদেশিকতার সঙ্গে আন্তর্জাতিকতা বোধের বিরোধ নেই কোনো। আবহমান কাল ধরে সে পূর্ণ মানুষের আরাধনায় ব্যস্ত। এ আরাধনার অন্তর আর বহিরঙ্গকে কবিতায়, ছবিতে, গানে কথকতায়, ধর্মাচারের সহিষ্ণুতায় শিল্পিত করে তুলেছে অসংখ্য মনীষী। মনীষার সজন আর দীপ্ত বাণীতে প্রকৃতির আহ্বানে সমৃদ্ধ, প্রাণিত বলেই বাঙালি সীমাকে প্রশ্রয় দেয়নি। সে আজ বিশ্বের বৃহত্তম জনগোষ্ঠী। এমন একটি জাতির গরিমা নিয়ে, দিগ্বিজয়ী হয়েও তার উজ্জ্বল অনুজ্জ্বল দিনগুলো, তার আবহমান ঐতিহ্য, তার যুক্তিবুদ্ধির, তার শুদ্ধতার অঙ্গীকার, ঐতিহ্যের বিস্তারকে বুকে জড়িয়ে সে যেকোনো সামাজিক সংকটে, আরোপিত দুর্যোগে, কখনো সজল উচ্চারণে, কখনো সমূহ দৃঢ়তায় উঁচু করে তর্জনিকে। গর্জে ওঠে তার নেতৃত্ব। এমন একটি জাগ্রত, প্রাণচঞ্চল জাতিকে ‘হিন্দু বাঙালি’ ‘মুসলিম বাঙালি’ বলে যারা খণ্ডিত দ্বিখণ্ডিত করতে চাইছে তাদের মূঢ়তার বিনাশ অবশ্যম্ভাবী। এদের দিকভ্রষ্ট নীতি আর ক্ষুদ্রতাপ্রীতির বাগাড়ম্বরের উদ্দেশে, প্রায় ৯৩ বছর আগে, নোয়াখালী সম্মেলনের অভিভাষণে, রবীন্দ্রভাবনায় উদ্বুদ্ধ, হুগলি জেলার কৃতী সন্তান এস ওয়াজেদ আলী (১৮৯০-১৯৫১) প্রকারান্তরে জাতিকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, আমরাও যদি এরকম চিত্কার করতে থাকি, শ্মশানের শৃগালের চিত্কার শুনেও যেমন পথিক দূরে সরে যায়, আমাদের সে বিকট চিত্কার শুনেও বিশ্ববাসী ভারতের দিগন্ত প্রসারিত শ্মশান থেকে দূরে সরে যাবে; আর আমরা নরমাংসলোলুপ রসনা সঞ্চালন করতে করতে রোষকষায়িত দৃষ্টিতে পরস্পরের দিকে চাইতে থাকবো।
বিপদকালের অন্তঃস্রোত আবার বইছে। উদ্ভ্রান্ত মস্তিষ্কের অঙ্গ সঞ্চালন ফের দেখা যাচ্ছে। সম্মিলিত তর্জনির গর্জন দিয়ে এদের রুখতে হবে। রুখতে হবে গঠনশীল রাজনীতির পাশে দাঁড়িয়ে বাঙালিয়ানার মানবিক মূর্ত, বিমূর্ত মুনশিয়ানা দিয়ে। জয় আমাদের সুনিশ্চিত। আর ওদের মিথ্যাপ্রেমের পরাজয় অবধারিত। সামনেই অগ্নিপরীক্ষা— দেখ লেনা জোর কিতনা তাকত বাজুয়ে কাতিল মে হ্যায়।
n লেখক: সম্পাদক আরম্ভ পত্রিকা
mail id: [email protected]
