ভালো নাই প্রবাসী বাংলাদেশিরা

আপডেট : ০৫ মে ২০২০, ২১:৪৬

প্রবাসী বাংলাদেশিরা আমাদের জন্য সোনার ডিম পাড়া রাজহাঁসের মতো। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তুলনামূলক সমৃদ্ধ হইবার নেপথ্যে রহিয়াছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের অবদান। করোনার জন্য লকডাউন কিংবা কারফিউর কারণে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী এখন বিদেশে কার্যত গৃহবন্দি রহিয়াছেন। এই জন্য গত মাসে এপ্রিলে সবচাইতে কম রেমিট্যান্স আসিয়াছে দেশে। টাকা পাঠানো দূরের কথা, অনেকেই নিজেরাই চলিতে পারিতেছেন না। এমনকি একাধিক দেশ হইতে প্রবাসীদের মানবিক বিপর্যয়ের খবরও আসিতেছে। আমাদের প্রায় ১৭ কোটি জনসংখ্যার দেশে করোনা পজিটিভের সংখ্যা প্রায় ১১ হাজার ছুঁইছুঁই করিলেও বিভিন্ন দেশে সোয়া কোটি বাংলাদেশির মধ্যে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ১১ হাজার ছাড়াইয়া গিয়াছে। অর্থাত্, দেশের চাইতে বিদেশেই অধিকসংখ্যক বাংলাদেশি কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত! বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখনো করোনা-সংক্রমণে বাংলাদেশের নাগরিকদের মৃত্যু ও আক্রান্ত হইবার ঘটনা অব্যাহত রহিয়াছে। ইহার মধ্যে সবচাইতে বেশি মারা গিয়াছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও সৌদি আরবে। সবচাইতে বেশিসংখ্যক ৮ সহস্রাধিক বাংলাদেশি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হইয়াছেন সিঙ্গাপুরে। কাতার ও সৌদি আরবে বাংলাদেশি আক্রান্তের সংখ্যা হাজারের অধিক।

প্রবাসে সিংহভাগ বাংলাদেশির জীবন খুব একটা স্বস্তির নহে। বিশেষ করিয়া প্রবাসী শ্রমিকদের জীবন। করোনা ভাইরাস তাহাদের সেই কষ্ট আরো বাড়াইয়া দিয়াছে। বহু ক্ষেত্রে প্রবাসীদের বৃহত্ একটি অংশের জীবন তছনছ হইয়া যাইতেছে। অনেকেই কাজ হারাইয়াছেন। অনেকে হারাইবার পথে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিক বেতন অর্ধেক করিয়া দিয়াছেন। যেই প্রবাসীদের আয় আমাদের অর্থনীতিতে গতিসঞ্চার করিতেছিল, সেই শ্রমিকদের দেশে ফিরিয়া আসিতে হইতে পারে। বিশ্ব অর্থনীতির গভীর মন্দার এই সময় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলিয়া আসিয়াছে। এই অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি সংকটে পড়িতে যাইতেছে, যাহার নেতিবাচক প্রতিফলন প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে দেখা দিতে পারে। ইতিমধ্যে যেই সকল শ্রমিকের পক্ষে দেশে টাকা পাঠানো সম্ভব হইতেছে না, তাহাদের উপর নির্ভরশীল পরিবারগুলি কীভাবে চলিতেছে, সেই খোঁজ কি কোনো দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান নিয়াছে? প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে যাহারা অস্থায়ী কিংবা চাকরি শেষে দেশে ফিরিবার প্রস্তুতি লইতেছেন, তাহারা বেশ নাজুক অবস্থায় রহিয়াছেন। ইতিমধ্যে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী দেশে ফিরিয়াছেন। তাহারা শুরুতে ভাবেন নাই করোনার অভিঘাত এত লম্বা হইবে। তাহাদের বড়ো অংশ ভবিষ্যতে পুনরায় প্রবাসে যাইতে পারিবেন কি না, সেই অনিশ্চয়তাও রহিয়া গিয়াছে। বিপুল বেকারের দেশে ইহাও একধরনের সংকট তৈরি করিবে। বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশের মিশনগুলি হটলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাহায্যে এই সময় যাহাতে প্রবাসীদের বিবিধ সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো গাফিলতি না করে, তাহা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সরকার কয়েক দফায় প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকার সহায়তা কর্মসূচি ঘোষণা করিলেও উহার মধ্যে প্রবাসীরা নাই। অথচ এই প্রবাসীরাই ফি বত্সর ১৬ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠান। সুতরাং তাহাদের জন্য কোনো সহায়তা কর্মসূচি না থাকাটা অস্বাভাবিক।