এক বীর মুক্তিযোদ্ধাকে স্মরণ

আপডেট : ০৫ মে ২০২০, ২১:৪৭

জুলফিকার আলী

তিন চাচা-ভাতিজা মিলে দুপুরবেলা টিনের ঘরের চাঙের ওপর উঠে কালিজিরা চুরি করলেন। সেই চুরি করা অর্ধেক বস্তা কালিজিরা বাজারে বিক্রি করে সেই টাকা নিয়ে এলাকার আরো কয়েকজন মিলে ভারতে যাবে। এটাই পরিকল্পনা। কিন্তু হায়দার আলীর বাবা-মা জেনে গেলেন তাদের ওই পরিকল্পনার কথা। পরিবারের সবাই মিলে তাদেরকে ঘরে বন্দি করে রাখলেন।  বলার অপেক্ষা রাখে না, সেটি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকের ঘটনা।

কিন্তু দেশ স্বাধীন করার অদম্য ইচ্ছা যার, তাকে ঘরে আটকে রাখা কি সহজ? পরের দিন খুব সকালে চার-পাঁচ জন তাদের ঘর থেকে পালাল। বাবা-মা টের পেয়ে গেলেন এবং ধরার জন্য পিছু নিলেন। পেছন থেকে হায়দারকে তার বাবা-মা ডাকছে আর বলছে, ‘বাবা যাসনে যাসনে বাবা, ফিরে আয়...’ কিশোর হায়দারের পেছনের ডাক  শোনার সময় নেই। পরিবার, আত্মীয়স্বজন, গ্রাম সব পেছনে পড়ে রইল। তিন দিন ধরে যেতে যেতে তারা পৌঁছে গেল ভারতের ২৪ পরগনা জেলার কল্যাণীতে। সেখানে কিছুদিন প্রশিক্ষণ নিয়ে চলে গেলেন বিহারে গেরিলা প্রশিক্ষণের জন্য।

বিহারে প্রশিক্ষক একজন ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর। মেজর সাহেব কিশোর হায়দার আলীকে দেখে হিন্দিতে বলেছিলেন, যা বাংলা করলে হয় এমন—‘তুমি অনেক ছোটো, তোমাকে আমি প্রশিক্ষণে নিতে পারব না’। কিন্তু হায়দার আলী ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি সাহস নিয়ে মেজর সাহেবকে বললেন, ‘আমাকে একটিবার সুযোগ দিন, আমি গেরিলা প্রশিক্ষণ নিতে পারব। আপনি ইচ্ছা হলে আমার পরীক্ষা করে নিতে পারেন। আমি যদি এই দলের মধ্যে ্একজন ভালো প্রশিক্ষণার্থী না হতে পারি, তাহলে ফিরে যাব’। প্রশিক্ষক মেজর সাহেব শেষ পর্যন্ত কিশোরের অনুরোধ রাখলেন এবং কঠিন একটা পরীক্ষা দিলেন। খুব ভালোভাবেই উত্তীর্ণ হলেন। শুধু তা-ই নয়, কয়েকদিন প্রশিক্ষণের পর প্রশিক্ষক ঐ ১৪-১৫ বছরের কিশোরকে তার দলের দলনেতা বানিয়ে দিলেন। যতদিন গেল ঐ কিশোরের প্রশিক্ষণ দেখে প্রশিক্ষক তত বেশি অবাক হলেন।

অবশেষে শুরু হলো ১৯৭১ সালে ১০ নম্বর সেক্টরে তার জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে তিনি আহতও হয়েছিলেন। কিশোর বয়সে তিনি যে পরিমাণ সাহসিকতা নিয়ে পাকিস্তানি আর্মির সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন, তা সত্যিই বিরল ও প্রশংসনীয়।

মুক্তিযুদ্ধে সফল হলেন হায়দার আলীরা। এবার স্বাধীন বাংলাদেশে আবার পড়াশোনায় ফিরলেন। এসময় তিনি রাজেন্দ্র কলেজের ছাত্র সংসদে প্রথমে এজিএস এবং পরে জিএস নির্বাচিত হন। ফরিদপুরের রাজেন্দ্র কলেজ থেকে বাংলায় বিএ (সম্মান) পাস করলেন।  যুবক হায়দার ভর্তি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করতে। স্বভাবতই জড়িয়ে পড়লেন বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতিতে। তুখোড় বক্তা হায়দার আলী নজর কাড়লেন তখনকার আওয়ামী নেতাদের। আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, ওবায়দুল কাদেরসহ সব জ্যেষ্ঠ নেতাদের স্নেহের ছিলেন হায়দার।

বঙ্গবন্ধু অন্তঃপ্রাণ হায়দার আলী যোগ দিয়েছিলেন বাকশালে। আবদুুর রাজ্জাকের হাত ধরে। বঙ্গবন্ধুর প্রতি তার ভালোবাসা এতটাই গভীর ছিল যে, হায়দার আলীর মুজিব কোটে কোনো দাগ লাগতে পারেনি। সত্যি কথা বলতে কী, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এতটা দৃঢ়তার সঙ্গে ধরে রাখা অনেকের জন্যই দুঃসাধ্য হলেও হায়দার আলী ছিলেন অটল। মেধাবী হায়দার আলী মোল্লা চাকরিও নিয়েছিলেন একটি ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে। কারণ বঙ্গবন্ধু ইন্স্যুরেন্সে চাকরি করতেন। যা হোক, বাস্তবে বাকশাল অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলে নানা ঘটনাপ্রবাহে। ফলে হায়দার আলী ফিরে আসেন আওয়ামী লীগে।

ব্যক্তিগত জীবনে নির্লোভ, আদর্শের প্রতি দৃঢ় হায়দার আলীকে অত্যন্ত স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে হয়েছে। তাতে তার কোনো আপত্তি ছিল না। বরং অনাড়ম্বর জীবনাচার তাকে করেছে আরো সমৃদ্ধ শ্রদ্ধেয়। লোভ, লালসা, পদপদবি, সুযোগ গ্রহণ এসব হায়দার আলীকে কখনোই ছুঁতে পারেনি। ঢাকাসহ সারা দেশে তাকে যারা গভীরভাবে চেনেন, তারা সবাই এই তত্ত্বটি সম্পর্কে অবগত।

আজ ৬ মে তার ১১তম মৃত্যুবাষিকী। তিনি বড্ড অসময়ে চলে গিয়েছেন। তিনি যেমন কিশোর বয়সে যুদ্ধ করেছেন ঠিক তেমনি তার ঐ মধ্য বয়সে চলে যাওয়া সমাজ, রাজনীতি ও পরিবারের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়েছে। তাকে এখন খুব বেশি প্রয়োজন ছিল আমাদের। তিনি বেঁচে থাকবেন সবার অন্তরে। তার স্বাভাবিকতা, তার সরলতা, তার সত্যবাদিতা, তার চেতনা, তার অপূরণীয় স্বপ্ন এবং সর্বোপরি তার আদর্শ আমাদের সমাজে বারবার ফিরে আসা প্রয়োজন।

n  লেখক: ব্যাংক কর্মকর্তা