টাঙ্গাইলের পালিমা গণহত্যা আড়ালেই রয়ে গেছে

আপডেট : ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮, ২১:২৬

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দীর্ঘ ৪৭ বছর পরেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে সবার চোখের আড়ালেই রয়ে গেছে পালিমা গণহত্যার ঘটনাটি। ১৯৭১ সালের ৮ আগস্ট টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার নারান্দিয়া ইউনিয়নের পালিমায় এই গণহত্যার ঘটনাটি ঘটে। সেদিনের ঘটনায় শহীদ হন ২০ জন। আগুনে জ্বালিয়ে দেয়া হয় অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি। অথচ সেই শহীদদের কেউ মনে রাখেনি। ‘গণহত্যা’ হিসেবে স্বীকৃতিটুকুও মেলেনি তাদের ভাগ্যে।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, সেদিন ছিল ১৯৭১ সালের ৮ আগস্ট রোববার। খুব ভোরবেলায় পাকিস্তানি হানাদারেরা পালিমা গ্রামে আক্রমণ চালায়। তারা যাকেই সামনে পেয়েছে তাকেই গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। আগুনে জ্বালিয়ে দিয়েছে অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি।

সেই গণহত্যায় যারা প্রাণ হারিয়েছেন তারা হলেন- পালিমা দক্ষিণপাড়ার রহিম উদ্দিনের ছেলে আব্দুল মিয়া, আয়েন উদ্দিনের ছেলে মফেজ উদ্দিন, আহাদি শেখের ছেলে ময়েজ উদ্দিন, গাজী মণ্ডলের ছেলে জাবেদ আলী, ঘুতু শেখের ছেলে পচা মণ্ডল, পালিমা গ্রামের জামাই হাছেন আলী (তিনি এলেঙ্গা-পাথাইলকান্দি গ্রামের মিয়াজানের ছেলে), পালিমা পালপাড়ার পচা শেখের ছেলে তরু শেখ ও তরু শেখের ছেলে ময়েন উদ্দিন, আনন্দ পালের ছেলে গেন্দা পাল ও সহদেব পালের ছেলে মদন পাল, পালিমা সিমাকাছরার অনুউল্লাহ সরকারের ছেলে আব্দুল হালিম, রইক্কা মুন্সির ছেলে মোসলেম উদ্দিন, টেনা আফছারের ছেলে হযরত আলী, ময়ন উদ্দিনের ছেলে আফাজ উদ্দিন, পালিমা মোড়সংলগ্ন জোনাব আলীর ছেলে ঝরু শেখ ও ইন্তাজ আলীর ছেলে হযরত আলী হজু এবং পালিমা উত্তরপাড়ার কছর শেখের ছেলে রিয়াজ উদ্দিন। এই ১৭ জনকে একদিনেই গুলি করে হত্যা করে বর্বর হানাদার বাহিনী। এ ছাড়া, গুলিবিদ্ধ হয়ে কিছুদিন ধুঁকে ধুঁকে অবশেষে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন আরও তিনজন। তারা হলেন- পালিমা দক্ষিণপাড়ার নছু শেখের ছেলে সায়েদ আলী, ঘুতু শেখের ছেলে আছান আলী ও গণহত্যার দিনে প্রাণ হারানো হাছেন আলীর স্ত্রী ফালানী বেগম।

গণহত্যায় নিহত পালিমা পালপাড়ার তরু শেখের ছেলে আমান আলী শেখ (৬৫) বলেন, ‘খুব ভোরবেলায় গোলাগুলির শব্দ শুইনা ঘুম ভাঙে। আমাগো পাড়ার সবাই ভয় পাইয়া যে যার মতো পালাইতে থাকে। আমরাও বাড়ির পাশে নদীর কাছারে গিয়া পালাই। আমার বাবা ও বড় ভাই ছিল আমার থেকে একটু দূরে। আমি জঙ্গলের ভিতর থেকে সব দেখছিলাম। আমার চোখের সামনেই ওরা আমার বাবা ও ভাইকে বুকে গুলি কইরা মাইরা ফালায়। সেদিনের কথা মনে হইলে অন্তরডা ফাইটা যায়।’ এই কথাগুলো বলতে বলতে একপর্যায়ে আমান আলী কেঁদে ফেলেন। গ্রামের আরো অনেকেই সেদিনের নির্মম গণহত্যার বর্ণনা দেন।

সেদিন পালিমার প্রতিরোধ যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন কাদেরিয়া বাহিনীর কোম্পানী কমান্ডার ঘাটাইলের খোরশেদ আলম তালুকদার বীরপ্রতীক। তিনি বলেন, ‘আমরা ১৯৭১ সালের ৭ আগস্ট শনিবার ভোরে কালিহাতী উপজেলার টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ সড়কের শোলাকুড়া ব্রিজ ধ্বংস করে পালিমা ব্রিজের উত্তরপাশে জসিম উদ্দিনের বাড়িসহ আশেপাশের কয়েকটি বাড়িতে অবস্থান নিই। পরদিন ৮ আগস্ট রোববার খুব ভোরে আমরা কিছু বুঝে উঠার আগেই হানাদারেরা পালিমা ব্রিজের দক্ষিণ পাশ থেকে আমাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে। আমরাও পাল্টা গুলি করি। এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলে গোলাগুলি। গুলির ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায় পুরো এলাকা। একপর্যায়ে আমরা হানাদারদের ভারী অস্ত্রের সামনে কুলিয়ে উঠতে না পেরে পিছিয়ে আসি। তখন তারা গ্রামের ভিতরে ঢুকে এই হত্যাযজ্ঞ চালায়।’ খোরশেদ আলম তালুকদার বলেন, ‘পালিমার এই ঘটনাটি লেখা না হলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। পালিমার গণহত্যায় শহীদদের অবশ্যই জাতিকে স্মরণ রাখতে হবে। রাষ্ট্রীয়ভাবেও সেদিনের শহীদদের স্বীকৃতি এবং আহতদের সহযোগিতা দেয়া উচিত।’

পালিমা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আমান আলী বলেন, ‘পালিমার প্রতিরোধযুদ্ধে সেদিন আমিও ছিলাম। হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে হানাদারেরা নির্বিঘ্নে চলে যায়। বেলা ১০/১১টার দিকে গ্রামের লোকজন নিয়ে আমরা সেখানে গিয়ে দেখি একেক জনের লাশ একেক জায়গায় ছিন্নভিন্ন হয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে। তারপর কোনোমতে লাশগুলো দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করি। সেদিনের ঘটনা মনে হলে আজও বুক কেঁপে উঠে।’