বন্যপ্রাণীর বিরুদ্ধে অপরাধের শাস্তি প্রয়োজন

আপডেট : ০৬ মে ২০২০, ২১:৩২

আমরা খুবই হতাশার সহিত লক্ষ করিয়াছি, দেশে সকলের চোখের সম্মুখে সংরক্ষিত বন্যপ্রাণী হত্যা, শিকার এমনকি ক্রয়বিক্রয় হইয়া থাকে। এবং প্রায়শই বন্যপ্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণের যে সংবাদ প্রকাশিত হয় তাহা কোনো সভ্য সমাজই গ্রহণ করিতে পারে না। মঙ্গলবার বিকালে কে বা কাহারা মাদারীপুরের চরমুগুরিয়ায় বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির ১১টি বানর হত্যা করিয়াছে। এলাকাবাসী ধারণা করিতেছে যে, এই বানরগুলিকে খাবারের সহিত বিষ মিশাইয়া হত্যা করা হইয়াছে। প্রশ্ন হইল, এই হত্যার মোটিভ কী? অপরাধশাস্ত্রের ভাষ্যে বলা আছে, প্রতিটি অপরাধের পেছনে, প্রতিটি হত্যার পেছনে একটি মোটিভ থাকে। আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার কোনো কোনো জাতি বানর খাইয়া থাকে। ভালোমন্দ যাহাই হউক, তাহাদেরও একটি মোটিভ আছে; কিন্তু মাদারীপুরের এই নির্মম বানর হত্যার প্রত্যক্ষ কোনো মোটিভ আমরা দেখিতে পাই না। বাংলাদেশে যখন প্রচুর বৃক্ষাদী, জলা, পুকুর ছিল, ফলফলাদি ছিল তখন দেশের প্রায় প্রতিটি এলাকায় প্রচুর বানর ছিল; কিন্তু সেই প্রকৃতি ধ্বংস করিয়া আমরা বানরসহ জীববৈচিত্র্য প্রায় ধ্বংসের মুখে ফেলিয়াছি। তাহার উপর এই ধরনের নির্মম কাণ্ড আমাদের আরো নিঃস্ব করিয়া ফালাইতেছে। 

সম্প্রতি বাংলাদেশের পানিতে আবার ডলফিন ঢুকিতে শুরু করিয়াছে। একসময় পদ্মাসহ বিভিন্ন নদী ছিল ধূসর ডলফিনের চারণক্ষেত্র। প্রকৃতির উপর মানুষের থাবায় তাহা বিতাড়িত হইয়াছিল; কিন্তু প্রায় তিন মাস ধরিয়া বাংলাদেশের প্রকৃতিতে মানুষের ছোঁয়া না থাকায় আবার তাহা ফিরিয়া আসিতে শুরু করিয়াছে; কিন্তু এই লকডাউনের মধ্যেও ডলফিনের প্রতি বৈরিতা সচেতন মানুষকে হতাশ করিতেছে। সমুদ্রসৈকতে ডলফিনের আনন্দ করিয়া লাফালাফি করার ভিডিও ভাইরাল হইবার দুই দিন পর দেখা গেল অন্তত তিনটি ডলফিন সৈকতে মৃত পড়িয়া আছে। ২৭ এপ্রিল শরীতপুরের ভেদরগঞ্জে জালে ধরা পড়িল ৩০ কেজি ওজনের ডলফিন। তাহারও কিছুদিন আগে পটুয়াখালীর গলাচিপায় আট মণ ওজনের একটি ডলফিন ধরা পড়িল। বাজারে দাম হাঁকা হইল ৩০ হাজার টাকা; কিন্তু আরো বেশি দাম পাইতে তাহা ঢাকায় চালান করা হইল! এই সকল মানুষ জানে না, বিজ্ঞানের মতে মানুষের পর দ্বিতীয় বুদ্ধিমান প্রাণী ডলফিন। বন্ধুভাবাপন্ন এই ডলফিন মানুষের সহায়তায় আগাইয়া আসার বহু কাহিনি রহিয়াছে। ইহা তো গেল মানবিক দিক। বাংলাদেশের  বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন, ২০১২-এর ৩৭(১) ধারায় পরিষ্কার বলা আছে, ‘তিমি বা ডলফিন হত্যা করিলে তিনি অপরাধী বলিয়া গণ্য হইবেন এবং উপরোক্ত অপরাধের জন্য তিনি সর্বোচ্চ তিন বত্সর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ৩ লক্ষ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন। একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটিলে সর্বোচ্চ পাঁচ বত্সর কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ৫ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।’ দুঃখের বিষয়—ইহাও ঐ অপরাধীরা জানে না। কারণ এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে ডলফিন হত্যা ও বিক্রয়ের অনেক ঘটনা ঘটিলেও কাহাকেও আইনের সম্মুখীন করা হইয়াছে বলিয়া আমাদের জানা নাই। আমরা আশা করিব, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের দায়িত্বে যাহারা রহিয়াছেন তাহারা দৃঢ়তার সহিত এই ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে সকল আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।